
সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও আজীবন ভোগাধিকার নিজের কাছে রাখার বিধান রেখে পাস হওয়া নতুন আইনটি প্রবীণ বয়সে মা-বাবার সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ১৮৮২ সালের ‘দ্য ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল’ পাসের মাধ্যমে এই আইনি সুরক্ষার পথ তৈরি হয়েছে। আইনবিদ ও অধিকারকর্মীদের মতে, বরিশালের গৌরনদী উপজেলার হালিমা বেগমের মতো অসহায় প্রবীণদের জন্য এই নতুন আইনটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। ২০২২ সালে স্বামীর দেওয়া ৬৪ শতাংশ জমি বড় ছেলে মাহাবুব আলম মৃধার নামে লিখে দেওয়ার পর ৮২ বছর বয়সী হালিমা বেগমকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। নিজের নামে আর কোনো সম্পত্তি না থাকায় তিনি কোনো আইনি দাবিও করতে পারেননি। নতুন আইনের ফলে এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার ব্যক্তিদের আজীবন সম্পত্তি ভোগের আইনি অধিকার বজায় থাকবে।
সংসদে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করেন। এই সংশোধিত আইনে দুটি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২২ (ক) ধারায় বলা হয়েছে, দাতা নিজের জীবদ্দশায় সম্পত্তির ভোগাধিকার নিজের কাছে রেখেও তা দান করতে পারবেন। এই ধারার চারটি উপধারা অনুযায়ী—মা-বাবা তাঁদের সন্তানকে, দাদা-দাদি বা নানা-নানি তাঁদের নাতি-নাতনিকে, সন্তান বা নাতি-নাতনিরা তাঁদের মা-বাবা ও দাদা-দাদি বা নানা-নানিকে এবং স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে সম্পত্তি দান করতে পারবেন। দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় গ্রহীতার মৃত্যু হলে সম্পত্তি গ্রহীতার ওয়ারিশদের কাছে যাবে, তবে দাতার আজীবন ভোগাধিকার অক্ষুণ্ন থাকবে।
এছাড়া ১২২ (খ) ধারায় বলা হয়েছে, দান করা সম্পত্তি নিবন্ধনের পর সাধারণত তা আর বাতিল করা যাবে না। তবে চিকিৎসা, শিক্ষা, আর্থিক বা পারিবারিক জরুরি প্রয়োজন মেটানোর জন্য নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে তা বাতিল বা পরিবর্তন করা সম্ভব। এই নতুন আইনটি সব ধর্মাবলম্বীর জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হবে এবং এটি প্রচলিত সাধারণ দান বা মুসলিম আইনের অধীনে ‘হেবা’র ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না।
সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরীন পারভিন হক এই সংশোধনীকে ইতিবাচক উল্লেখ করে বলেন, সন্তানরা মা-বাবার পেনশনের টাকা কেড়ে নেওয়া বা সম্পত্তি লিখে নিয়ে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা প্রায়ই ঘটে। এই আইন প্রবীণদের সুরক্ষা দেবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানান, এটি মুসলিম পারিবারিক আইনের কোনো সংশোধন নয়, বরং সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধন। মুসলিম আইনে দানের যে বিধান রয়েছে, তা আগের মতোই অক্ষুণ্ন আছে। মা-বাবাকে অসহায়ত্ব থেকে মুক্তি দিতেই এই ভালো নিয়তে আইনটি করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমীন বলেন, সম্পত্তি দান করার পর সন্তানরা অনেক সময় মা-বাবার খোঁজ নেয় না। নতুন আইনের ফলে সন্তান মালিক হলেও মা-বাবার ভোগাধিকার থাকবে, যা বিশেষ করে মা ও নারীদের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম এটিকে সরকারের একটি সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীরা এর মাধ্যমে বেশি উপকৃত হবেন, তবে দীর্ঘমেয়াদে এর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখের বেশি, যা মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ।
তবে বিলটি পাসের সময় জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের সদস্যরা এটিকে শরিয়তসম্মত নয় দাবি করে ক্ষণিকের জন্য কক্ষ ত্যাগ করেন এবং পরে ফিরে এসে বিতর্কে অংশ নেন। এছাড়া জামায়াতে ইসলামী এই সংশোধনীকে ‘কোরআন-সুন্নাহবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহারের দাবিতে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার আইনটি প্রত্যাহারের দাবি জানান। অন্যদিকে, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা শায়েখ সাজিদুর রহমান এক বিবৃতিতে জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের সুরক্ষায় যেকোনো পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানালেও আইনটি যেন মূল ইসলামি মিরাস বা হেবার বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, তা নিশ্চিত করতে আরও পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২