
দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য কমাতে এবং হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব যে ছয়টি নাগরিক সেবাকেন্দ্র চালু করেছিলেন, তার বেশিরভাগই এখন বন্ধ হয়ে গেছে। পাইলট প্রকল্পের আওতায় ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় চালু হওয়া এই ছয়টি কেন্দ্রের মধ্যে চারটিতেই এখন তালা ঝুলছে। বাকি দুটি কোনোমতে মাঝেমধ্যে খোলা হলেও সেখানে সেবাদানকারী বা সেবাপ্রার্থী কারও দেখা মেলে না।
গত ২৭ আগস্ট ঢাকার মোহাম্মদপুর সাব-পোস্ট অফিসের দ্বিতীয় তলায় স্থাপিত নাগরিক সেবাকেন্দ্রটিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কক্ষটি পুরোপুরি ফাঁকা। দুটি টেবিল ও কয়েকটি চেয়ার অগোছালোভাবে পড়ে আছে, তবে কোনো মানুষ নেই। মোহাম্মদপুর সাব-পোস্ট অফিসের কর্মীরা জানান, গত বছর কার্যক্রম শুরুর পর প্রথম কয়েক দিন একজন উদ্যোক্তা ল্যাপটপ নিয়ে আসতেন, তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে যেতেন। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁকে আর আসতেই দেখা যায়নি।
মোহাম্মদপুরের এই কেন্দ্রের উদ্যোক্তা মো. মুস্তাকিম আগে একটি কম্পিউটারের দোকান চালাতেন। নিয়মিত আয়ের আশায় সেই পেশা ছেড়ে তিনি এই সেবাকেন্দ্রে যুক্ত হয়েছিলেন। মুস্তাকিম জানান, সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত কিছুই দেওয়া হয়নি। মানুষও সেবা নিতে আসছিল না, যার কারণে তিনি নিজেও আর কেন্দ্রে যান না।
একই চিত্র দেখা গেছে নীলক্ষেত ও গুলিস্তানের সেবাকেন্দ্রেও। বিটিসিএল কার্যালয়ের দুটি কক্ষ নিয়ে চালু হওয়া নীলক্ষেত কেন্দ্রটি ২৭ আগস্ট দুপুরে তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। সেখানকার উদ্যোক্তা রাজিত খান জানান, যেসব সেবা দেওয়ার কথা ছিল, তার কিছুই দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। সংসার চালানোর তাগিদে বাধ্য হয়ে কেন্দ্র বন্ধ রেখে তিনি এখন অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন। অন্যদিকে, গুলিস্তানের টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অফিসের ভেতরের সেবাকেন্দ্রটিতেও ওই দিন বেলা সাড়ে ১১টায় তালা ঝুলতে দেখা যায়।
উত্তরা কেন্দ্রের উদ্যোক্তা আশিকুর রহমান জানান, আসবাব ও কক্ষ সাজানো ছাড়া সেবা দেওয়ার মতো কোনো সরঞ্জাম তিনি পাননি। নিজের ল্যাপটপ দিয়ে কাজ শুরু করলেও পাসপোর্ট অফিস থেকে দেওয়া একমাত্র বায়োমেট্রিক মেশিনটি কয়েক মাস আগে ফেরত নেওয়া হয়েছে।
২০২৫ সালের ২৬ মে ‘এক ঠিকানায় সকল নাগরিক সেবা’ স্লোগান নিয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এই পাইলট প্রকল্পের উদ্বোধন করেন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। উদ্বোধনের সময় তিনি বলেছিলেন, ভোগান্তিমুক্ত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব তখন দাবি করেছিলেন, শূন্য বাজেটে দেশের বিদ্যমান সম্পদ ব্যবহার করেই এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
বাস্তবে, নিজেদের চালু করা এই উদ্যোগ সচল রাখতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার নিজেই। ইন্টারনেট সংযোগ, কম্পিউটার, প্রিন্টার, বায়োমেট্রিক যন্ত্র কিংবা সরকারি পোর্টালের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ—কোনোটিই যথাসময়ে নিশ্চিত করা হয়নি। এমনকি সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি না থাকায় উদ্যোক্তারা নিজেদের নামে ইন্টারনেট সংযোগও নিতে পারেননি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
আইসিটি বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, উদ্যোগটি আসলে ওপর-ওপর নেওয়া হয়েছিল এবং এটি ছিল ‘লোকদেখানো’। সরকার গুরুত্ব দিলে এর জন্য আলাদা বাজেট ও প্রচারের ব্যবস্থা করত। আইসিটি বিভাগের ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ও সিকিউরিটি অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মো. মজিবর রহমান জানান, নাগরিক সেবাকেন্দ্রের কার্যক্রম খুব বেশি টেকসই হয়নি এবং প্রত্যাশিত সুফল না পাওয়ায় সরকার এ নিয়ে আর এগোয়নি। তবে প্রয়োজনে ভিন্নভাবে এটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। আগের উদ্যোগগুলো কেন সফল হয়নি, তা বিশ্লেষণ করা জরুরি। টেকসই সমাধান চিন্তা না করে উদ্যোগ নিলে কেবল উদ্যোগের সংখ্যাই বাড়বে, কিন্তু সমস্যার সমাধান হবে না। উল্লেখ্য, এই কাঠামোর কাছাকাছি সেবা দেওয়া ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলো (ইউডিসি) বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চালু হয়েছিল। বর্তমানে আইসিটি বিভাগ ‘রুরাল ডিজিটাল সেন্টার’ নামে নতুন সেবাকেন্দ্র চালুর বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২