
বাংলা সিনেমার রোমান্টিক নায়ক হিসেবে উত্তম কুমারের তুমুল জনপ্রিয়তা এবং সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর কালজয়ী জুটির কথা সবারই জানা। কিন্তু কেবল এই পরিচয়ের মধ্যে তাঁকে সীমাবদ্ধ রাখলে তাঁর অভিনয়ক্ষমতার এক বিশাল অংশ আড়ালেই থেকে যায়। উত্তম কুমারের আসল কৃতিত্ব ছিল নিজের তৈরি করা জনপ্রিয়তার ছকে নিজেকে বন্দি না রেখে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের ইমেজ ভেঙে নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করা। আর এই রূপান্তরের মধ্য দিয়েই তিনি সাধারণ একজন অভিনেতা থেকে হয়ে উঠেছিলেন ‘মহানায়ক’।
অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় নামের এই গুণী শিল্পীর রূপালি পর্দায় অভিষেক হয়েছিল ১৯৪৮ সালে ‘দৃষ্টিদান’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। তবে তাঁর শুরুর পথটা মসৃণ ছিল না। একের পর এক ছবি ব্যর্থ হওয়ায় তাঁর নামের পাশে ‘ফ্লপ মাস্টার’ তকমাও সেঁটে গিয়েছিল। তবে ১৯৫২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘বসু পরিবার’ এবং ১৯৫৩ সালের ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবি দুটি তাঁর ভাগ্য বদলে দেয়। বিশেষ করে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর জুটি বাংলা চলচ্চিত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করে。
পঞ্চাশের দশকে উত্তম কুমার মূলত রোমান্টিক নায়ক হিসেবেই দর্শকদের হৃদয়ে স্থান করে নেন। ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘হারানো সুর’, ‘সাগরিকা’ ও ‘সপ্তপদী’র মতো বহু চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মোহাবিষ্ট করে রাখে। অতি-নাটকীয়তা এড়িয়ে চোখের ইশারা, মুখের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বর ও শরীরী ভাষার পরিমিত ব্যবহারের মাধ্যমে আবেগ ফুটিয়ে তোলাই ছিল তাঁর অভিনয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য। অনেক সময় তাঁর নীরব চাহনিও সংলাপের চেয়ে বেশি কথা বলত।
তবে ষাটের দশকে এসে উত্তম কুমারের অভিনয়ে এক বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তিনি শুধু জনপ্রিয় রোমান্টিক ইমেজেই আটকে না থেকে জটিল ও মনস্তাত্ত্বিক চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করতে শুরু করেন। ‘এন্থনি ফিরিঙ্গি’, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘চিড়িয়াখানা’ এবং সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ ছবিতে তাঁর অভিনয় এই বিবর্তনের বড় প্রমাণ। ১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘নায়ক’ ছবিতে তিনি অভিনয় করেন সুপারস্টার অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রে, যা বাইরে থেকে সফল হলেও ভেতরে ছিল একাকীত্ব, অনুশোচনা ও নিরাপত্তাহীনতায় জর্জরিত। নিজের বাস্তব জীবনের তারকা-পরিচয়কেই যেন তিনি এই চরিত্রের সংলাপে ও অভিনয়ে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
সত্তরের দশকে তাঁর অভিনয়ের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। ‘অমানুষ’, ‘সন্ন্যাসী রাজা’, ‘অগ্নীশ্বর’, ‘মৌচাক’, ‘সব্যসাচী’ ও ‘দুই পৃথিবী’র মতো নানা ঘরানার চলচ্চিত্রে তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। কখনো গম্ভীর, কখনো রহস্যময়, আবার কখনো সামাজিক বাস্তবতার চরিত্রগুলোতে তিনি সফলভাবে মিশে গিয়েছিলেন। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তিনি প্রযোজক, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, সংগীত পরিচালক এবং গায়ক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছিলেন।
উত্তম কুমারের মহাপ্রয়াণের পর ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর অভিনয় নিয়ে আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তাঁর জন্মশতবর্ষে এসে এই মূল্যায়ন আরও বেশি গুরুত্ব বহন করে। পঞ্চাশের দশকের স্বপ্নের পুরুষ থেকে ষাটের দশকের জটিল মানুষ এবং সত্তরের দশকে পরিণত চরিত্রের অভিনেতা হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ যাত্রাই তাঁকে বাংলা সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২