
একটি যুদ্ধ কখন শেষ হয়? শেষ বোমাটি পড়লে, শেষ সৈন্যটি ফিরে এলে, নাকি প্রতিপক্ষ নিজের শর্ত মেনে নিলে? ইরানের বিরুদ্ধে সাত মাসের বোমাবর্ষণ, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও নৌ অবরোধের পরও ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ফেরাতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষের বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু সেই শক্তি দিয়েই তাকে নিজের রাজনৈতিক শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করা যায় কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। ২২ সেপ্টেম্বর হরমুজ দিয়ে মাত্র অল্পসংখ্যক বাণিজ্যিক জাহাজ অতিক্রম করেছে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের দৈনিক তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজিরও প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে যায়। এখন সেখানে জাহাজ চলাচল এতটাই কমেছে যে সামরিক উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভিয়েতনামের পুরোনো শিক্ষাকে সামনে নিয়ে এসেছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হয়েছিল 'ভিয়েতনাম সিনড্রোম', যা শুধু নতুন যুদ্ধে সৈন্য পাঠানোর ভয় নয়, বরং সামরিক শক্তি দিয়ে রাজনৈতিক ফল অর্জন করা যায় কি না তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি করেছিল। ১৯৭৫ সালের ৩০ এপ্রিল সায়গনের পতনের ছবি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির স্থায়ী প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। ভিয়েতনাম দেখিয়েছিল, একটি দেশকে ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা সম্ভব হলেও তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিজের ইচ্ছামতো তৈরি করা যায় না। যদিও ১৯৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধের পর প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ভিয়েতনাম সিনড্রোমকে পরাস্ত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, কিন্তু শত্রু সেনাকে হারানো আর যুদ্ধের পর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করা যে এক নয়, তা এখন স্পষ্ট।
গাজা সংকটও আন্তর্জাতিক নিয়মের সমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের উপস্থিতিকে বেআইনি বলে মত দেয় এবং গণহত্যা মামলায় অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার নির্দেশ দেয়। এমন পটভূমিতে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া হরমুজ সংকটে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তির ভারসাম্য রাখলেও রাজনৈতিক পরাজয়ের মুখে পড়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে পেন্টাগনের হিসাবে এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যেখানে অন্তত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৮৩০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
ইরানের হাতে রয়েছে হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক সুবিধা। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল ও বিশ্বের মোট এলএনজির এক-পঞ্চমাংশ এই পথে যেত। ব্যাপক বিমান হামলা ও বন্দর অবরোধ সত্ত্বেও ইরান তার দাবি থেকে সরেনি। ২২ সেপ্টেম্বর যুদ্ধের আগের দৈনিক প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজের তুলনায় চলাচল অতি অল্পসংখ্যায় নেমে এসেছে। এই সংকট দেখিয়েছে, একটি যুদ্ধজাহাজ সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও বাণিজ্যিক জাহাজের মালিককে পণ্য পরিবহনের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। যুদ্ধের অর্থনীতিতে সস্তা ড্রোন ঠেকাতে ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার আক্রমণকারীর খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে আঞ্চলিক সহযোগিতার পথ খুঁজছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনো মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তি, কিন্তু প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—সেই শক্তি দিয়ে কে কতটা রাজনৈতিক ফল অর্জন করতে পারে। হরমুজ প্রণালির সংকীর্ণ ভূগোল বদলায়নি, কিন্তু তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অর্থ বদলেছে। অর্ধশতাব্দী আগের ভিয়েতনামের সেই শিক্ষা আজ হরমুজে যেন আবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে: যুদ্ধ শুরু করার ক্ষমতা আর নিজের শর্তে যুদ্ধ শেষ করার ক্ষমতা এক নয়।
১৯৯০ সালে ইরাক কুয়েত আক্রমণ করলে পরিস্থিতি বদলে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন পতনের পথে, চীন আজকের তুলনায় অনেক দুর্বল। যুক্তরাষ্ট্র একটি বড় আন্তর্জাতিক জোট গড়ে তোলে। ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয় অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম। ছয় সপ্তাহের বিমান অভিযানের পর স্থল অভিযান চলে মাত্র ১০০ ঘণ্টা। কুয়েত মুক্ত হয়। ওয়াশিংটনে আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ঘোষণা করেন, ‘ঈশ্বরের কসম, আমরা চিরতরে ভিয়েতনাম সিনড্রোমকে পরাস্ত করেছি।’ কিন্তু উপসাগরীয় যুদ্ধের বিজয় একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আড়াল করেছিল—শত্রুর সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করা আর যুদ্ধের পর একটি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করা এক বিষয় নয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২