
ভারতের শীর্ষ ধনী ব্যবসায়ী মুকেশ আম্বানির ছেলে অনন্ত আম্বানিকে যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয় ‘প্রফেসরশিপ অব প্র্যাকটিস’ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণ এবং বন্য প্রাণী, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষায় অনন্ত আম্বানির ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এই সম্মানজনক পদ দেওয়া হয়েছে। তবে এই নিয়োগের ঘোষণার পরপরই ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের পরিবেশবিদ, বন্য প্রাণী সংরক্ষণকর্মী ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে তীব্র বিস্ময় ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
৩১ বছর বয়সী অনন্ত আম্বানি রিলায়েন্স গ্রুপের নির্বাহী পর্ষদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ৯ হাজার কোটি পাউন্ড। তাঁর বাবা মুকেশ আম্বানি মূলত তেল ও গ্যাস ব্যবসা থেকে সম্পদ গড়েছেন এবং তাঁর মালিকানায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার রয়েছে। গুজরাটে তাঁদের মালিকানাধীন তেল শোধনাগারের কাছে ১ হাজার ৪০০ হেক্টর (৩ হাজার ৫০০ একর) জায়গাজুড়ে অনন্ত আম্বানি ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানা ‘ভান্তারা’ গড়ে তুলেছেন। সেখানে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি প্রাণী রয়েছে বলে জানা গেছে, যার মধ্যে ২০০টি সিংহ, ২৫০টি চিতাবাঘ ও ৯০০টি কুমির রয়েছে। গত ২০২৪ সালে মুম্বাইয়ে অনন্ত আম্বানির জাঁকজমকপূর্ণ বিয়েতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অংশ নিয়েছিলেন, যেখানে তারকা ও রাজনীতিবিদেরা উপস্থিত ছিলেন।
অনন্ত আম্বানির এই নিয়োগ নিয়ে সমালোচকদের প্রধান অভিযোগ, ভান্তারায় বিপন্ন প্রজাতির প্রাণীগুলো কীভাবে আনা হয়েছে তা নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। জার্মান সংবাদপত্র সুড্ডয়চে সাইটুংয়ের ২০২৫ সালের এক অনুসন্ধানে বলা হয়েছিল, ভান্তারায় আনা অনেক প্রাণী গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (ডিআর কঙ্গো) ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মতো দেশ হয়ে এসেছে, যেখানে বন্য প্রাণী কেনাবেচার নেটওয়ার্ক সম্পর্কে স্বচ্ছতা কম। এতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে, বিপন্ন প্রজাতির কিছু প্রাণী হয়তো অবৈধভাবে আনা হয়েছে। যদিও গত বছরের আগস্টে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের তদন্তে চিড়িয়াখানাটির পরিচালকদের কোনো অনিয়মের জন্য দায়ী করা হয়নি। তবে জাতিসংঘের বিপন্ন বন্য প্রাণী কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা সাইটিস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভান্তারায় প্রাণী আনার জন্য ব্যবহার করা কিছু অনুমতিপত্র সম্ভবত জাল ছিল। সংস্থাটি ভারতকে বিপন্ন বন্য প্রাণী আমদানির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপের সুপারিশ করেছিল, যদিও ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান এর বিরোধিতা করেছিল।
ভারতের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী ও ‘স্পিকিং উইথ নেচার: দ্য অরিজিনস অব ইন্ডিয়ান এনভায়রনমেন্টালিজম’ বইয়ের লেখক রামচন্দ্র গুহ এই নিয়োগকে ‘রহস্যজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, পরিবেশ নিয়ে কাজ করা এমন অন্তত ৫০ থেকে ১০০ জন ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁরা এই পদের জন্য অনন্ত আম্বানির চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য। নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠানটির বুদ্ধিবৃত্তিক মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কর্মীরাও এই নিয়োগের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড কলেজ ইউনিয়ন শাখার সভাপতি অধ্যাপক ম্যাট পেরি জানান, পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীরা এই নিয়োগের বিরোধিতা করেছিলেন। অন্যদিকে সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের অধ্যাপক লায়লা মেহতা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সরকারি অর্থায়ন কমে যাওয়ায় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অর্থ শিক্ষা ও গবেষণায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হলো ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা, তাদের একাডেমিক স্বীকৃতি দেওয়া নয়।
অয়েল চেঞ্জ ইন্টারন্যাশনালের গবেষণা বিভাগের সহপরিচালক লর্ন স্টকম্যানও জলবায়ু সংকটের এই সময়ে তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানের উত্তরাধিকারীকে এমন পদ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। যদিও নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র দাবি করেছেন, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, প্রাণী কল্যাণ ও পরিবেশের যত্নে কাজের স্বীকৃতি হিসেবেই তাঁকে এই পদ দেওয়া হয়েছে। গত এপ্রিলে অনন্ত আম্বানি ‘ভান্তারা ইউনিভার্সিটি’ চালু করেন, যা বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও পশুচিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। আগস্টে চিড়িয়াখানাটি তাদের কার্যক্রমে ‘নতুন করে শুরু’ করার ঘোষণা দেয় এবং সাইটিসের সাবেক প্রধানকে কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব দেয়। আম্বানি পরিবার ও ভান্তারা এর আগে বন্য প্রাণী পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, প্রাণীদের উদ্ধার, পুনর্বাসন ও যত্ন নেওয়াই তাদের লক্ষ্য।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২