
দক্ষিণ লেবাননের বিন্ত জবেইল জেলার ফ্রাউন গ্রামের স্কুলটির সামনে দাঁড়ালে বোঝার উপায় নেই যে এর চারপাশের পরিবেশ কতটা বদলে গেছে। দেয়ালের ওপারে কেবলই ধ্বংসস্তূপ—ভাঙা কংক্রিট, বাঁকা লোহা আর এমন কিছু দরজা যা এখন আর কোনো ঘরে খোলে না। বৈরুত থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার দূরত্বের এই গ্রামে যুদ্ধবিরতির পর মানুষ ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের বাড়িঘর আর আগের মতো নেই। বিদ্যুৎ ও পানির তীব্র সংকটের মধ্যেই ঘনিয়ে আসছে ১৫ সেপ্টেম্বর, যেদিন লেবাননে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার কথা।
এই কঠিন পরিস্থিতির মাঝেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্বাস মাক্কি তার ছোট অফিসে বসে নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার টেবিলে শিক্ষার্থীদের তালিকার পাশাপাশি রয়েছে আরেকটি তালিকা—যাঁরা ঘর হারিয়ে এখন এই স্কুলেই আশ্রয় নিয়েছেন। স্কুলটি এখন একই সাথে শিক্ষার জায়গা এবং আশ্রয়কেন্দ্র। মাক্কি বলেন, “আমরা স্কুল খুলব। কিন্তু যারা এখানে আশ্রয় নিয়েছে, তাদেরও ছাড়ব না।”
যুদ্ধবিরতির পর ফ্রাউনের মানুষ যখন ফিরে আসে, তখন তারা নিজেদের চেনা বসতভিটার জায়গায় শুধু ধ্বংসস্তূপ দেখতে পায়। নতুন সমঝোতার অধীনে এই এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনাদের সরে যাওয়া এবং লেবাননের সেনাবাহিনীর প্রবেশের কথা ছিল। মানুষ ফিরে এলেও তাদের বাড়িগুলো আর ফিরে আসেনি। তাদেরই একজন সুজুদ রামাদান, যিনি এখন এই স্কুলেই আশ্রয় নিয়েছেন। টিকে থাকার লড়াইয়ে স্কুলের প্রবেশপথেই তিনি বিস্কুট, নাশতা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের একটি ছোট দোকান খুলেছেন। গ্রামের দোকানপাট ধ্বংস হওয়ায় এই দোকানটিই এখন স্থানীয়দের ভরসা। রামাদানের ভাষায়, “যুদ্ধবিরতির পর ফিরে এসে দেখলাম পুরো গ্রাম ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে আমি আশা করি, ফ্রাউন আবার আগের মতো, হয়তো তার চেয়েও সুন্দর হবে।”
নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে এখন বড় প্রশ্ন—আশ্রয় নেওয়া এই মানুষগুলো কোথায় যাবেন? ইউনেস্কোর শিক্ষা বিশেষজ্ঞ মাইসুন চেহাবের মতে, একটি স্কুল একই সাথে আশ্রয়কেন্দ্র ও স্বাভাবিক পাঠদানের স্থান হিসেবে চলতে পারে না। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো স্কুলে থাকলে ক্লাস শুরু হতে দেরি হবে অথবা শ্রেণিকক্ষ ছোট হয়ে যাবে। কিন্তু বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না করে এই মানুষগুলোকে বের করে দেওয়াও সম্ভব নয়।
এই জটিল সংকটের সমাধানে লেবাননের শিক্ষামন্ত্রী রিমা কারামি জানিয়েছেন, কোনো শিক্ষার্থীকে যেমন শিক্ষার বাইরে রাখা হবে না, তেমনি বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া কোনো বাস্তুচ্যুত মানুষকেও স্কুল থেকে সরানো হবে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কোথাও বাস্তুচ্যুতদের সরকারি থেকে বেসরকারি স্কুলে স্থানান্তর করা হচ্ছে, আবার কোথাও ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্কুলের জায়গায় অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষ তৈরি করা হচ্ছে। ফ্রাউনেও আশ্রয় নেওয়া মানুষদের জন্য অস্থায়ী ঘর বানানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে শিশুরা ক্লাসে ফিরতে পারে।
লেবাননের এই সংকট নতুন নয়। গত সাত বছর ধরে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও নানা সংকটে শিশুদের শিক্ষাজীবন বারবার থমকে গেছে। দক্ষিণ লেবাননের তিন শতাধিক স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আরও কয়েকশ স্কুল কোনো না কোনোভাবে ব্যাহত হয়েছে। মাইসুন চেহাব জোর দিয়ে বলেন, সম্পূর্ণ political শান্তি বা নিরাপত্তার জন্য শিক্ষা অপেক্ষা করতে পারে না। শিশুদের এখনই নিরাপদ শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে এনে তাদের জীবনে স্বাভাবিকতা ফেরানো জরুরি। ১৫ সেপ্টেম্বর ফ্রাউনের স্কুলে যখন ঘণ্টা বাজবে, তখন একদিকে থাকবে ঘরহারা মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই, অন্যদিকে থাকবে শিশুদের নতুন করে শুরু করার স্বপ্ন। এই দুই বিপরীত বাস্তবতাকে সঙ্গী করেই শুরু হতে যাচ্ছে লেবাননের নতুন শিক্ষাবর্ষ।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২