
১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর ভোররাত। জার্মানির সীমান্তবর্তী শহর গ্লাইভিৎসের একটি রেডিও স্টেশনে হঠাৎ ঢুকে পড়ে একদল সশস্ত্র লোক। পোলিশ বিদ্রোহীদের পোশাকে থাকা এই ব্যক্তিরা স্টেশনের কর্মীদের জিম্মি করে পোলিশ ভাষায় ঘোষণা দেয়, ‘এটি গ্লাইভিৎস। সম্প্রচারকেন্দ্রটি এখন পোলিশদের হাতে।’ আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারত পোল্যান্ডই জার্মানির ওপর হামলা চালিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল নাৎসি জার্মানির আধা সামরিক বাহিনী ‘এসএস’-এর একটি সাজানো নাটক। পোল্যান্ডে সামরিক আগ্রাসন চালানোর অজুহাত তৈরি করতেই জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাডলফ হিটলার বিশ্ববাসীকে বোকা বানাতে এই ছক কষেছিলেন।
এই নাটকের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর, ভোর ৪টা ৪৫ মিনিটে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই পোল্যান্ডের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে জার্মান বাহিনী। বাল্টিক সাগরের ডানজিগ বন্দরের কাছে পোলিশ সামরিক ঘাঁটি ভেস্টারপ্লাটে গোলাবর্ষণ শুরু করে জার্মান যুদ্ধজাহাজ শ্লেসভিগ-হলস্টাইন। একই সঙ্গে স্থল, নৌ ও আকাশপথে শুরু হয় আকস্মিক হামলা। এভাবেই সূচনা হয় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী অধ্যায়—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের।
এই ভয়াবহ যুদ্ধের বীজ বপন করা হয়েছিল মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর। ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি পরাজিত হওয়ার পর ১৯১৯ সালে তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল ‘ভার্সাই চুক্তি’। এই চুক্তির কঠিন শর্তে জার্মানিকে বিশাল ভূখণ্ড হারাতে হয়, সামরিক শক্তি সীমিত করা হয় এবং ঘাড়ে চাপে বিপুল পরিমাণ যুদ্ধ ক্ষতিপূরণের বোঝা। জার্মানরা এই চুক্তিকে জাতীয় অপমান হিসেবে দেখত, যা তাদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিশোধের জন্ম দেয়।
এই ক্ষোভকে পুঁজি করেই উত্থান ঘটে অ্যাডলফ হিটলারের। ১৯১৯ সালে তিনি অতি ডানপন্থী ‘জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টিতে’ যোগ দেন, যা পরে ‘নাৎসি পার্টি’ নামে পরিচিতি পায়। ১৯২১ সালে দলের নেতৃত্ব পাওয়ার পর তাঁর উগ্র জাতীয়তাবাদী বক্তব্য দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৩২ সালের নির্বাচনে নাৎসি পার্টি জার্মানির বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং ১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি হিটলার চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর ১৯৩৩ সালে ‘এনাবলিং অ্যাক্ট’ পাসের মাধ্যমে তিনি আইন প্রণয়নের পূর্ণ ক্ষমতা নিজের হাতে নেন। ১৯৩৪ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট পল ফন হিন্ডেনবার্গের মৃত্যুর পর চ্যান্সেলর ও প্রেসিডেন্ট পদ একীভূত করে হিটলার নিজেকে জার্মানির সর্বোচ্চ নেতা বা ‘ফুয়েরার’ ঘোষণা করেন।
ক্ষমতা সুসংহত করে হিটলার তাঁর সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্য পূরণে এগোতে থাকেন। ১৯৩৬ সালে তিনি ভার্সাই চুক্তি ভেঙে ‘সামরিকীকরণমুক্ত অঞ্চল’ রাইনল্যান্ডে সৈন্য পাঠান। ফ্রান্স ও ব্রিটেন তখন কোনো কড়া পদক্ষেপ না নেওয়ায় তাঁর সাহস আরও বেড়ে যায়। এরপর ১৯৩৮ সালে অস্ট্রিয়াকে জার্মানির সঙ্গে যুক্ত করেন এবং মিউনিখ চুক্তির মাধ্যমে চেকোস্লোভাকিয়ার সুদেতেনল্যান্ড দখল করেন। ১৯৩৯ সালের মার্চের মধ্যে পুরো চেকোস্লোভাকিয়াই তাঁর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ‘তুষ্টনীতি’ হিটলারের aggression-কে আরও উসকে দেয় এবং তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় পোল্যান্ড।
ভার্সাই চুক্তির আওতায় স্বাধীন নগররাষ্ট্র ঘোষিত হওয়া ডানজিগ শহরটি ফেরত চান হিটলার। একই সঙ্গে পূর্ব প্রুশিয়ায় যাওয়ার জন্য পোল্যান্ডের মধ্য দিয়ে সড়ক ও রেলপথের দাবি জানান তিনি। পোল্যান্ড এই দাবি প্রত্যাখ্যান করলে পোল্যান্ড আক্রমণের ছক চূড়ান্ত করা হয়। ১ সেপ্টেম্বর আক্রমণের পর নাৎসি বাহিনী পোল্যান্ডে নির্বিচারে গণহত্যা চালায়, যা ছিল পরবর্তী সময়ে সংঘটিত হলোকাস্টের এক ভয়াবহ পূর্বাভাস।
হিটলার ভেবেছিলেন যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স হয়তো নিষ্ক্রিয় থাকবে, কিন্তু তাঁর সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। জার্মানিকে পোল্যান্ড থেকে সেনা প্রত্যাহারের আলটিমেটাম দেয় দুই দেশ। আলটিমেটামে সাড়া না দেওয়ায় ৩ সেপ্টেম্বর প্রথমে যুক্তরাজ্য এবং পরে ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপজুড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলেও প্রথম দিকে মিত্রবাহিনী কার্যকর কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ফলে ৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই জার্মান বাহিনী পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশর উপকণ্ঠে পৌঁছে যায়।
এই যুদ্ধে জার্মানির প্রধান সহযোগী বা অক্ষশক্তি ছিল ইতালি ও জাপান। পরবর্তীতে হাঙ্গেরি, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, স্লোভাকিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডও এই জোটে যোগ দেয়। ১৯৪০ সালে ইতালি যুদ্ধে নামলেও ১৯৪৩ সালে মিত্রবাহিনীর অভিযানের পর তারা আত্মসমর্পণ করে। অন্যদিকে, ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর পার্ল হারবারে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে জাপান এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে টেনে আনে।
wars-এর এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ১৯৪১ সালের ২২ জুন, যখন হিটলারের নির্দেশে ৩০ লাখের বেশি জার্মান সেনা সোভিয়েত ইউনিয়ন জয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। প্রথম দিকে তারা রাশিয়ার অনেকটা অংশ দখল করলেও স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধে রেড আর্মির তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে। স্তালিনগ্রাদের এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ‘র্যাটেনক্রিগ’ বা ইঁদুরের যুদ্ধ নামে পরিচিত। দীর্ঘ ছয় মাস যুদ্ধের পর ১৯৪৩ সালের ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রায় ১ লাখ জার্মান সেনা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এই পরাজয় জার্মান বাহিনীর মনোবল পুরোপুরি ভেঙে দেয়।
এর পর থেকে মিত্রবাহিনী দুই দিক থেকে জার্মানির দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ১৯৪৫ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে সোভিয়েত বাহিনী বার্লিনে প্রবেশ করলে ৩০ এপ্রিল নিজের ভূগর্ভস্থ বাংকারে আত্মহত্যা করেন হিটলার। তাঁর মৃত্যুর পর কার্ল দনিৎসের নেতৃত্বাধীন নতুন জার্মান সরকার নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়। ৭ মে ফ্রান্সের রেইমসে এবং পরে ৮ মে বার্লিনে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করে জার্মানি। এর মাধ্যমে ইউরোপে যুদ্ধের অবসান ঘটলেও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলতে থাকে। অবশেষে ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা হামলার পর ১৫ আগস্ট জাপান আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেয় এবং ২ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করে।
ছয় বছরের এই মহাপ্রলয়ে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১১ কোটি মানুষ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। যুদ্ধ, গণহত্যা ও বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়ে প্রাণ হারান প্রায় ৬ থেকে ৭ কোটি মানুষ, যার বড় অংশই ছিল সাধারণ বেসামরিক নাগরিক। শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নেই মারা যান ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ। এছাড়া চীনে ১ কোটি ৫০ লাখ, জার্মানিতে ৭০ লাখ এবং পোল্যান্ডে ৬০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এই যুদ্ধ বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দেয়, যার ফলে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা পায় এবং পরবর্তীতে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়া হিটলার ১৯১৯ সালে এ দলে যোগ দেন।১৯২০ সালে দলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি’।
১৯৪৪ সালে সোভিয়েত বাহিনী পূর্ব দিক থেকে এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও এদের মিত্ররা পশ্চিম থেকে জার্মানির দিকে অগ্রসর হতে থাকে।১৯৪৫ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে সোভিয়েত বাহিনী বার্লিনে প্রবেশ করে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২