

জর্ডানে অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক স্থাপনায় ইরানের হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। গত মার্চের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর এই প্রথম সরাসরি ইরানি হামলায় কোনো মার্কিন সামরিক স্থাপনায় সেনার প্রাণহানি ঘটল। গত শুক্রবারের এই ঘটনা ওয়াশিংটনের জন্য এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা সামনে এনেছে। এটি প্রমাণ করে যে যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক বিমান হামলার পরও একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার মতো সামরিক সক্ষমতা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) এখনো রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এসব সেনা মূলত এমন কিছু স্থায়ী ও আধা স্থায়ী ঘাঁটিতে কাজ করছেন, যা ইরানের দিন দিন শক্তিশালী হতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বহরের একদম নাগালের মধ্যে এবং বেশ অরক্ষিত। লন্ডনের কিংস কলেজের স্কুল অব সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ জানান, এ সেনাদের অনেকেই আধা স্থায়ী ব্যারাকে থাকেন, যা মূলত রকেট, মর্টার বা দেশীয় প্রযুক্তির বোমার (আইইডি) আঘাত সামলানোর উপযোগী। ভারী যুদ্ধাস্ত্র বহনকারী নিখুঁত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা এগুলোর নেই। ফলে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের সুনির্দিষ্ট আঘাত মার্কিন ঘাঁটিগুলোয় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ডেকে আনছে।
ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ নামের গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সামরিক বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক জেনিফার কাভানাফ আল-জাজিরাকে বলেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা এখনো বেশ শক্তিশালী এবং তারা প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুতগতিতে নিজেদের পুনর্গঠিত করেছে। রাশিয়া ও চীনের গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইরানের হামলাগুলো আরও বেশি নিখুঁত ও সুনির্দিষ্ট হয়ে উঠছে বলে তিনি ধারণা করছেন। পেন্টাগন দাবি করেছিল যে ইরান যুদ্ধ করার ক্ষমতা হারিয়েছে, কিন্তু কাভানাফের মতে, তারা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির শিকার হলেও সময়ের সঙ্গে নতুন শিক্ষা নিচ্ছে এবং নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে।
ক্রিগের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি ঘাঁটিতে আঘাত না হানলেও এর তীব্র বিস্ফোরণের প্রচণ্ড চাপে (ব্লাস্ট ওভারপ্রেশার) সেনারা গুরুতর ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরিতে পড়ছেন। আবার ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র মাঝ আকাশে ধ্বংস করা হলেও সেটির ভেঙে পড়া ধ্বংসাবশেষের আঘাতেও সেনারা আহত হচ্ছেন। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলমান এই যুদ্ধে অফিশিয়ালি নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে। এর মধ্যে গত ১ মার্চ কুয়েতের একটি ট্যাকটিক্যাল অপারেশন সেন্টার ও সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সাত মার্কিন সেনা নিহত হন। জর্ডানের এই তিনজন ছাড়া অন্য সেনাদের মৃত্যু ইরানের সরাসরি হামলায় হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে মার্চে জ্বালানি নেওয়ার সময় এক বিমান দুর্ঘটনায় ছয় বৈমানিক নিহত হন এবং অতি সম্প্রতি ইরাকে ভূপাতিত করা একটি সশস্ত্র ড্রোনের নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটাতে গিয়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর এক সার্জেন্ট প্রাণ হারান। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। এছাড়া ৮ জুলাই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বড় ধরনের সামরিক সরঞ্জাম ও ভবনসহ প্রায় ২২০টি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যেমন ‘প্যাট্রিয়ট’ সারফেস-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং ‘থাড’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে ইরান ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, ইরান এমন কিছু ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং সশস্ত্র ড্রোন তৈরি করেছে, যা ভিন্ন ভিন্ন গতি ও ভিন্ন ভিন্ন পথ ধরে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। এর সঙ্গে যখন তারা নকল লক্ষ্যবস্তু ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা উৎক্ষেপণকেন্দ্র ব্যবহার করে, তখন মার্কিন প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকটাই কমে যায়। ধেয়ে আসা অধিকাংশ অস্ত্র ধ্বংস করা সম্ভব হলেও প্রতিরক্ষা ঢাল ভেদ করে সামান্য কয়েকটি অস্ত্র ভেতরে ঢুকে পড়লেই তা বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটাতে পারে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক মোনা ইয়াকুবিয়ান মনে করেন, যুদ্ধের শুরুর সপ্তাহগুলোর তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ের হামলাগুলোয় মার্কিন সামরিক স্থাপনায় আঘাত করার ক্ষেত্রে ইরান অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে। তিনি বলেন, মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোয় আঘাত হানার জন্য ইরানের সাম্প্রতিক হামলার তীব্রতা দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এটি তাদের একটি নতুন কৌশল। এর পেছনে ইরানের নিখুঁত নিশানা করার ক্ষমতা বৃদ্ধি, মার্কিন প্রতিরক্ষা ও রাডার ব্যবস্থার কার্যকারিতা কমে যাওয়া অথবা বিপুল সংখ্যায় হামলার কারণে দু-একটি ভাগ্যের জোরে লেগে যাওয়া আঘাতের মতো কারণগুলো একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান টানা ১২ দিন ধরে একে অপরের ওপর পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। ইরানের সেনাবাহিনীর দাবি, অতি সম্প্রতি তারা জর্ডানের প্রিন্স হাসান ও কিং ফয়সাল ঘাঁটিতে মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান, ড্রোন প্রস্তুতকরণ কেন্দ্র ও হেলিকপ্টার রাখার হ্যাঙ্গার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। একই সময় বাহরাইনের সামরিক বাহিনীও জানিয়েছে যে তারা ইরান থেকে ধেয়ে আসা বেশ কয়েকটি ড্রোন মাঝপথেই আটকে দিয়েছে। অন্যদিকে, উত্তেজনা বৃদ্ধির জেরে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে বারবার বিমান হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনী মূলত ইরানের সামরিক অপারেশন সেন্টার, সামুদ্রিক সক্ষমতা, বিমানের হ্যাঙ্গার, ড্রোন মজুত রাখার কেন্দ্র ও সামরিক লজিস্টিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে এ হামলাগুলো পরিচালনা করেছে।
এদিকে মার্কিন সিনেটে তীব্র জবাবদিহির মুখে পড়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের সামরিক বাহিনী ‘কার্যত ধ্বংস’ হয়ে গেছে বলে তিনি যে দাবি করেছিলেন, তা নিয়ে সিনেটররা তাকে একহাত নিয়েছেন। সিনেটর জন অসফ সরাসরি প্রশ্ন করেন, যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে হেগসেথ দাবি করেছিলেন যে ইরানের সামরিক বাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে, সেই বক্তব্য সঠিক ছিল কি না। জবাবে হেগসেথ নিজের অবস্থানে অনড় থেকে এ যুদ্ধকে একটি ‘ঐতিহাসিক সামরিক বিজয়’ হিসেবে আখ্যা দেন এবং দাবি করেন যে ইরানের নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও তাদের প্রতিরক্ষাশিল্পের ভিত্তি পুরোপুরি অকেজো করে দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, ইরান যে একদমই হামলা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে, তা তারা কখনো আশা করেননি।
পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা ও মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো জেসন ক্যাম্পবেল অবশ্য হেগসেথের যুক্তির ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, মার্কিন হামলা সত্ত্বেও ইরান শুধু তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতাই টিকিয়ে রাখেনি, বরং তারা এমন কিছু অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার শুরু করেছে, যা আগে কখনো করেনি। তারা বড় ও শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, যা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে পারে। ক্যাম্পবেলের মতে, মার্কিন শীর্ষ নেতৃত্ব প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের বিষয়টি অনেক বাড়িয়ে বলেছে। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বাথের জ্যেষ্ঠ সহযোগী অধ্যাপক ও ন্যাটোর সাবেক গবেষণা বিশ্লেষক প্যাট্রিক ব্যুরিও এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, ওয়াশিংটনের বিশাল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও নিকট ভবিষ্যতে ইরান মার্কিন সেনা ও স্থাপনার ওপর এমন প্রাণঘাতী আঘাত অব্যাহত রাখতে সক্ষম হবে।
প্যাট্রিক ব্যুরি আরও বলেন, মার্কিন সামরিক শক্তির সামনে আসল সমস্যা হলো ব্যয়ের চরম অসংগতি। ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি এবং উৎক্ষেপণের খরচ, সেগুলো মাঝ আকাশে ঠেকানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত আধুনিক সরঞ্জামের খরচের চেয়ে অনেক গুণ কম। এই বিশাল খরচের পার্থক্যের কারণেই ইরান কৌশলগত দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘায়েল করতে পারছে। আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে পরাজিত করার কোনো প্রয়োজন ইরানের নেই। মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির উপস্থিতির ওপর মানবিক, সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে মার্কিন প্রতিরক্ষা ঢাল ভেদ করে মাঝেমধ্যে কয়েকটি নিখুঁত আঘাত হানতে পারাটাই ইরানের জন্য যথেষ্ট।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২