
মহামারির দ্বিমুখী আক্রমণে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাব্যবস্থা বর্তমানে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখোমুখি। একদিকে ডেঙ্গু জ্বরের ক্রমবর্ধমান বিস্তার, অন্যদিকে বছরের শুরু থেকে দেশজুড়ে জেঁকে বসা তীব্র হামের প্রাদুর্ভাব দেশের হাসপাতালগুলোকে এক প্রকার পঙ্গু করে ফেলেছে। প্রাপ্তবয়স্ক ও তরুণরা যখন ডেঙ্গুর কামড়ে শয্যা নিচ্ছেন, তখন শিশুদের কোমল শরীর হামের ছোবলে নীল হয়ে যাচ্ছে। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রান্তিক জেলাগুলোর সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। শয্যা না পেয়ে রোগীরা হাসপাতালের বারান্দা, করিডোর এবং মেঝেতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ছয় মাসে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৪,৮৪৮ জন এবং প্রাণ হারিয়েছেন ৭১ জন। একই সময়ে মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া হামের প্রাদুর্ভাব অত্যন্ত উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। ল্যাব-পরীক্ষিত ও উপসর্গযুক্ত মিলিয়ে মোট আক্রান্ত ও সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৪৩ হাজার ছাড়িয়েছে এবং প্রাণ হারিয়েছেন ৯১৫ জন। এই দুই সংক্রামক ব্যাধির যুগপৎ আক্রমণ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ও টিকাদান কর্মসূচির ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। শিশু ওয়ার্ডগুলোর প্রতিটি শয্যায় ২-৩ জন করে শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের জেলা হাসপাতালগুলোতেও একই চিত্র দেখা গেছে। হাম আক্রান্ত শিশুদের শরীরে তীব্র জ্বর, ফুসকুড়ি ও নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা দেখা দেওয়ায় জরুরি আইসিইউ বা এইচডিইউ সহায়তার তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
হাসপাতাল প্রশাসন অতিরিক্ত রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক সাধারণ ওয়ার্ডকে রাতারাতি আইসোলেশন ওয়ার্ডে রূপান্তর করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ধারণক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ রোগী ভর্তি হওয়ায় সংক্রামক রোগ ও অসংক্রামক রোগীদের আলাদা রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া জেলা হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট এবং হামের ল্যাবরেটরি নিশ্চিতকরণের সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা টানা ডিউটি ও লোকবল সংকটের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টারের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক প্রফেসর ডা. হালিমুর রশিদ জানান, হামের টিকা থেকে যারা বাদ পড়েছে তাদের খুঁজে বের করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়ার জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে মশা নিধনে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালানো হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম বারী এই পরিস্থিতিকে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকট হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ডেঙ্গুর চার ধরনের টাইপের কারণে উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া জরুরি। এছাড়া হামের ক্ষেত্রে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ২ কোটি ৩০ লাখ শিশুর মধ্যে প্রায় ১৪ শতাংশ বা ৪০ লাখ শিশু টিকার বাইরে রয়ে গেছে। তিনি টিকাদানের বয়সসীমা ৬ মাস থেকে ১০ বছর পর্যন্ত বাড়ানো এবং হামের বিষয়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণার পরামর্শ দিয়েছেন।
মশা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রমের সমালোচনা করে বলেন, কেবল প্রথাগত স্প্রে করার চেয়ে বৈজ্ঞানিক উপায়ে লার্ভিসাইডিং এবং আধুনিক হটস্পট ম্যানেজমেন্ট প্রয়োগ করা প্রয়োজন। তিনি কমিউনিটি এনগেজমেন্ট বা সামাজিক অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ডেঙ্গু রোগীদের তথ্যের ভিত্তিতে এবং ড্রোন প্রযুক্তির সহায়তায় মশা নিধনে বিশেষ অভিযান ও টিকাদান ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২