
একসময় অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমানো বাংলাদেশিদের কাছে মূলধারার রাজনীতি ছিল বেশ দূরের বিষয়। নতুন দেশে এসে পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা আর একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার লড়াইয়েই ব্যস্ত থাকতে হতো সবাইকে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এসেছে। অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতরা এখন কেবল প্রার্থীই হচ্ছেন না, বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে বসছেন কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল টেবিলে। নিউ সাউথ ওয়েলসের একাধিক কাউন্সিলে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জনপ্রতিনিধিদের এই জোরালো উপস্থিতি প্রমাণ করছে যে, অভিবাসী হিসেবে শুরু হওয়া এই যাত্রা এখন নেতৃত্বের শিখরে পৌঁছাতে শুরু করেছে।
ক্যাম্পবেলটাউন, ক্যামডেন, কাম্বারল্যান্ড, ক্যান্টারবেরি-ব্যাংকসটাউন ও ডাব্বোর স্থানীয় সরকারে বাংলাদেশি প্রতিনিধিদের এই বিজয় কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের আস্থা অর্জন করে তারা নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। এটি অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক সমাজে বাংলাদেশি কমিউনিটির ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও গ্রহণযোগ্যতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। নির্বাচিতদের কেউ একাধিকবার জয়ী হয়েছেন, কেউ প্রথমবার অংশ নিয়েই বাজিমাত করেছেন, আবার কেউ কেউ পেয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব।
ক্যাম্পবেলটাউন সিটি কাউন্সিলে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মাসুদ চৌধুরীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার দীর্ঘদিনের। ১৯৯১ সালে লেবার পার্টিতে যোগ দেওয়া মাসুদ চৌধুরী ২০১৬ সালে প্রথমবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। এরপর ২০২১ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনেও জয়ী হয়ে তিনি টানা তৃতীয়বারের মতো কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মাসুদ চৌধুরী জানান, অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সরকারে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হিসেবে ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পালন করা তার জন্য অত্যন্ত গর্বের। তবে এটি কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এর সঙ্গে বড় ধরনের দায়বদ্ধতাও জড়িয়ে রয়েছে। ক্যাম্পবেলটাউনের সব মানুষের জন্য কাজ করাই তার মূল লক্ষ্য। বহু সংস্কৃতির এই এলাকার উন্নয়নে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চান তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশি কমিউনিটির নতুন প্রজন্মকে অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার রাজনীতি ও জনসেবায় আরও বেশি এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
একই কাউন্সিলে রয়েছেন আরেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মাসুদ খলিল। ২০২১ সালের নির্বাচনে ‘কমিউনিটি ভয়েস’-এর ব্যানারে প্রথমবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন তিনি। এরপর ২০২৩–২৪ মেয়াদে কাউন্সিলরদের ভোটে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হিসেবে ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনেও তিনি পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। মাসুদ খলিল জানান, তিনি সবসময় কমিউনিটির সাধারণ মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন। তবে তার কাজ কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য তিনি কাজ করতে চান। স্থানীয় সরকারের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবার তিনি রাজ্য রাজনীতিতেও ভূমিকা রাখতে চান। ২০২৭ সালের নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্য নির্বাচনে ম্যাককুয়ারি ফিল্ডস আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন তিনি। ক্যাম্পবেলটাউনে এবার নতুন মুখ হিসেবে যুক্ত হয়েছেন অ্যাশ রহমান, যিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া ক্যান্টারবেরি-ব্যাংকসটাউন সিটি কাউন্সিলে লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই জয় পেয়েছেন শিরিন আক্তার।
নারীদের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রায় এক নতুন ইতিহাস তৈরি করেছেন এলিজা রহমান। ২০২৪ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্যামডেন সিটি কাউন্সিলের কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পেয়েছেন। নিউ সাউথ ওয়েলসের স্থানীয় সরকারে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী হিসেবে এই পদে বসার গৌরব অর্জন করেছেন তিনি। বর্তমানে তিনি লেবার পার্টির ক্যামডেন ব্রাঞ্চের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। এলিজা রহমান বলেন, ডেপুটি মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হওয়া আমার জন্য যেমন সম্মানের, তেমনি এটি একটি বড় দায়িত্ব। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী হিসেবে এই অর্জন নতুন প্রজন্মের নারীদের জনসেবায় এগিয়ে আসতে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করবে। তিনি ক্যামডেনকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ ও বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
কাম্বারল্যান্ড সিটি কাউন্সিলের ওয়েন্টওর্থভিল ওয়ার্ড থেকে টানা তিনবার নির্বাচিত হয়ে হ্যাটট্রিক করেছেন সুমন সাহা। ২০১৭ সালে প্রথমবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর ২০২১ ও ২০২৪ সালেও তিনি পুনর্নির্বাচিত হন। ২০২২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি কাউন্সিলের ডেপুটি মেয়রের দায়িত্বও সফলভাবে পালন করেন। সুমন সাহা জানান, ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় আসার সুবাদে শিক্ষার্থীদের নানা চ্যালেঞ্জ তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তরুণদের শিক্ষা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং স্থানীয় রাস্তার নিরাপত্তা ও পার্কের উন্নয়ন নিশ্চিত করা তার অন্যতম লক্ষ্য। তার বিশ্বাস, যেকোনো বড় পরিবর্তনের সূচনা হয় তৃণমূল পর্যায় থেকেই।
এদিকে নিউ সাউথ ওয়েলসের আঞ্চলিক কাউন্সিল ডাব্বোতে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন শিবলী চৌধুরী। ২০২১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর ২০২৪ সালের নির্বাচনেও তিনি পুনর্নির্বাচিত হন। শিবলী চৌধুরী জানান, ডাব্বোতে বাংলাদেশি কমিউনিটির সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে কাজ করার দারুণ অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও ঐক্যই তাদের মূল শক্তি। স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যেই তিনি কাজ করে যাচ্ছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২