
বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের একসময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী নাসিমা খান আর নেই। গত রোববার (১১ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে রাজধানীর উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
নাসিমা খানের মৃত্যুর খবর শুনে গভীরভাবে শোকাহত হয়েছেন তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু ও সহকর্মী, বরেণ্য অভিনেত্রী কোহিনূর আখতার সুচন্দা। তিনি তাঁর স্মৃতিচারণ করে বলেন, "মনে হচ্ছে বড় বোনকে চিরদিনের জন্য হারালাম।" সুচন্দা জানান, নাসিমা আপার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এতটাই গভীর ছিল যে, তিনি তাঁকে নিজের বড় বোনের মতোই মনে করতেন।
১৯৫৯ সালে 'জাগো হুয়া সাভেরা' চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বড় পর্দায় যাত্রা শুরু করেছিলেন নাসিমা খান। এরপর ষাটের দশকে ঢাকা ও লাহোরের চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
সুচন্দা স্মরণ করেন, জহির রায়হান পরিচালিত 'দুই ভাই' ছবিতে কাজ করতে গিয়েই নাসিমা খানের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। সম্ভবত ১৯৬৭ সালের দিকে ছবিটির শুটিং হয়েছিল এবং মুক্তি পায় ১৯৬৮ সালে। সে সময় দুজনই তাঁদের অভিনয়জীবনের শুরুর দিকে ছিলেন। ছবিতে তাঁরা দুই বোনের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন—নাসিমা খান ছিলেন বড় বোন এবং সুচন্দা ছোট বোন। শুটিংয়ের সেই সম্পর্ক তাঁদের বাস্তব জীবনেও সত্যি হয়ে উঠেছিল। সুচন্দা বলেন, "আমার নিজের তো কোনো বড় বোন নেই। নাসিমা আপার মধ্যে যেন সেই অভাবটা যেন খুঁজে পেয়েছিলাম।"
'দুই ভাই' ছবির শুটিংয়ের স্মৃতিচারণ করে সুচন্দা অবাক হয়ে বলেন, মাত্র ১৪ দিনে ছবিটির গল্প তৈরি, শুটিং, ডাবিং—সব কাজ শেষ হয়েছিল। সেই সময়ে কাজের প্রতি সবার আন্তরিকতা ছিল অপরিসীম। তিনি জানান, রাজ্জাক, নাসিমা খান এবং তাঁরা সবাই ঠিকমতো ঘুমাতে না পেরে অ্যান্টি স্লিপিং পিল খেয়ে শুটিং করেছিলেন। ঢাকা ও কুমিল্লায় হয়েছিল ছবিটির শুটিং। জহির রায়হানের টিমে আমজাদ হোসেন, মোস্তফা মেহমুদ, নুরুল হক বাচ্চু, রহিম নেওয়াজ এবং ক্যামেরায় আফজাল এইচ চৌধুরী ছিলেন। সুচন্দা আরও বলেন, অ্যান্টি স্লিপিং পিল খেয়ে শুটিংয়ের কারণে কাজ শেষে বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে ঘুমাতে গিয়েও ঘুম আসত না, যা ছিল এক অদ্ভুত ব্যাপার। পরে 'দুই ভাই' সিনেমার কোনো এক কাজে আবার এফডিসিতে ছুটে গিয়েছিলেন তাঁরা।
দেশ স্বাধীনের আগে চলচ্চিত্রের পরিবেশের কথা উল্লেখ করে সুচন্দা বলেন, এফডিসি তখন তাঁদের প্রথম বাড়ির মতো ছিল, যেখানে কাজ থাকুক বা না থাকুক, তাঁরা চলে যেতেন। থাকার বাড়ি ছিল অনেকটা দ্বিতীয় বাড়ি। সবার মধ্যে যে আন্তরিকতা ও ভালোবাসা ছিল, তা এখন ভাবা যায় না। নাসিমা খানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটাও তেমনই ছিল।
শিল্পী হিসেবে নাসিমা খানকে খুব ভালো ও সুন্দর দেখতে একজন সাবলীল অভিনেত্রী হিসেবে বর্ণনা করেন সুচন্দা। সহশিল্পী হিসেবে তাঁর সঙ্গে দারুণ বোঝাপড়া ছিল। একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে কখনো মনে হয়নি তাঁরা শুধুই সহকর্মী। পর্দায় দুই বোনের চরিত্রে অভিনয় করলেও শুটিং শেষেও সেই সম্পর্ক তাঁদের মধ্যে বজায় থাকত। 'দুই ভাই' ছাড়াও আরও কয়েকটি ছবিতে তাঁরা একসঙ্গে কাজ করেছেন, তবে 'দুই ভাই' ছবির স্মৃতি সুচন্দার কাছে সব সময় আলাদা।
সময়ের সঙ্গে তাঁদের দেখা-সাক্ষাৎ কমে আসে এবং শেষের কয়েক বছরে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হয়নি। সুচন্দা জানান, কয়েক মাস আগে নাসিমা খানের ছেলেকে নিয়ে একটি দুঃসংবাদ শুনে তিনি তাঁর খোঁজ নিয়েছিলেন, কিন্তু এরপর আর কথা বলা হয়ে ওঠেনি।
ঠিক সপ্তাহ দুয়েক আগে ইউটিউবে 'দুই ভাই' ছবিটি দেখছিলেন সুচন্দা। পুরোনো দিনের অনেক স্মৃতি মনে পড়ছিল। তিনি নাসিমা খানের সঙ্গে কথা বলার কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু ব্যস্ততার কারণে আর যোগাযোগ করা হয়নি। এই আফসোসটা যে এভাবে থেকে যাবে, তা কে জানত! গত রোববার রাতে একজন সাংবাদিকের কাছ থেকে নাসিমা খানের মৃত্যুর খবর শুনে নিজেকে সামলাতে পারেননি সুচন্দা। তাঁর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছিল এবং মনে হচ্ছিল, এটা কী করে হলো! সারা রাত ঘুমাতে পারেননি তিনি। ছবির মতো পুরোনো সব স্মৃতি, 'দুই ভাই' ছবির শুটিং, একসঙ্গে কাটানো সময়, হাসি-আড্ডা—সব তাঁর চোখের সামনে ভাসছিল।
সুচন্দা বলেন, "আমার মনে হয়েছে, সত্যিকারের একজন বড় বোনকে হারালাম। নাসিমা আপার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা খুব মধুর ছিল। তাঁর মতো একজন ভালো মানুষ ও গুণী শিল্পীর চলে যাওয়া মেনে নেওয়া কঠিন। তাঁর সেই ভালোবাসা, আন্তরিকতা, হাসি আর কখনো পাব না। আমার নিজের বড় বোন ছিল না, কিন্তু নাসিমা আপাকে আমি বড় বোনের মতোই পেয়েছিলাম। আজ তাঁকে হারিয়ে মনে হচ্ছে বড় বোনকে চিরদিনের জন্য হারালাম।"
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২