
দেশের শিক্ষা খাতের বিভিন্ন সমস্যা, সংকট ও মান নিয়ে নানা প্রশ্নের মধ্যে আজ পালিত হচ্ছে মহান শিক্ষা দিবস। ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিলেন মোস্তফা, বাবুল ও ওয়াজিউল্লাহসহ অসংখ্য ছাত্র। শহীদের রক্তস্নাত এই দিনটিকে ছাত্রসমাজ প্রতিবছর শিক্ষা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। তবে স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান এখনো অর্জিত হয়নি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সাড়ে ১৫ বছরে এ খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে বলে তারা জানিয়েছেন।
সবশেষ কোটা ও বৈষম্যমুক্ত শিক্ষার দাবিতে চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর শিক্ষার উন্নয়ন নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত ৪৩টি কর্মসূচি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের আশ্বাস দিচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে গত সাত মাসে কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে। তবে শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠনসহ অন্যান্য প্রতিশ্রুতির দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চান সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞরা আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর, নৈতিকতা ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়নসহ শিক্ষায় বড় ধরনের সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ এবং গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংকের (ইউটিএল) সাংগঠনিক সম্পাদক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বিলাল হোসাইন বলেন, বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তার ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও গুণগত মান নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিটি স্তরেই এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। শুধু সনদ অর্জন নয়, একজন শিক্ষার্থী কতটা জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ অর্জন করছে, সেটিই মূল বিষয়। তিনি আরও বলেন, বর্তমান ব্যবস্থার অন্যতম সংকট হলো মুখস্থনির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা। ফলে ডিগ্রি অর্জন করলেও অনেকে কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। এই প্রেক্ষাপটে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে হবে এবং শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিতে হবে।
সরকারের সাত মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহ্দী আমিন শিক্ষা খাতের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, তরুণদের কর্মসংস্থান উপযোগী করতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে সবার জন্য এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এছাড়া প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পাঠ্যক্রমে নতুন চারটি বই অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া, কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়নে চীনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর, কক্সবাজারে বিশেষায়িত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এবং প্রতিবছর ৫০৯ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে শতভাগ সৌদি সরকারি শিক্ষাবৃত্তি প্রদানের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে কওমি ও আলিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিতে ২০২৬-৩১ মেয়াদে বিনামূল্যে সুষম দুপুরের খাবারের রূপরেখা প্রণয়ন এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে ঘোষিত ১৫টি অনুশাসন বাস্তবায়নের কাজ চলছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকার শিক্ষা খাতকে গুরুত্ব দিয়ে বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়ে জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করেছে এবং পর্যায়ক্রমে তা ৫ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। ইশতেহার অনুযায়ী প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস, বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা এবং বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস প্রদানসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ‘শিক্ষা সংস্কার কমিশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখনো তার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। এছাড়া স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে পাঁচটি শিক্ষা কমিশন ও তিনটি শিক্ষানীতি হলেও আজ পর্যন্ত কোনো শিক্ষা আইন প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। সবশেষ ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি এবং প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনটি খসড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।
শিক্ষার সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ ও সরকারি কবি নজরুল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ড. হেদায়েত উল্লাহ বলেন, দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থা হতাশাজনক। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা দরকার, যেখানে নৈতিকতাও গুরুত্ব পাবে। তিনি আরও বলেন, দলীয় চেতনায় উপাচার্য ও শিক্ষক নিয়োগ এবং ছাত্ররাজনীতি সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও ছাত্ররাজনীতি সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। এছাড়া আলিয়া মাদরাসায় থিওলজির বিষয়গুলো সংকুচিত করায় শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে এবং কওমি শিক্ষাধারায় ৪০ লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর বিপরীতে সঠিক মনিটরিংয়ের অভাবে নৈরাজ্য চলছে। এ বিষয়ে সরকারকে শক্তিশালী আইন প্রণয়ন করার পরামর্শ দেন তিনি।
এদিকে আওয়ামী সরকারের সময়ে ২০২২ সালে নতুন কারিকুলাম চালু হলেও চব্বিশের জুলাই-পরবর্তী তা স্থগিত করে ২০১২ সালের পুরোনো কারিকুলামে ফিরে যায় সরকার। বর্তমানে সেটিই চালু আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের পর বর্তমান বিএনপি সরকারও পাঠ্যবই এবং কারিকুলামে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২