
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য যেমন অগ্রগতির স্বীকৃতি, তেমনি এটি একটি বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার ইঙ্গিত। বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই উত্তরণের ফলে রপ্তানি খাতে ৬৩৮ কোটি ডলারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতদিন উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কে পণ্য রপ্তানির যে সুবিধা বাংলাদেশ পেয়ে আসছিল, উত্তরণের পর তার একটি অংশ হারানোর ফলে রপ্তানি পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তৈরি পোশাকসহ প্রধান রপ্তানি খাতগুলোতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি ওষুধের মেধাস্বত্ব, রপ্তানি প্রণোদনা ও আন্তর্জাতিক সহায়তার ক্ষেত্রেও নানা পরিবর্তন আসবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ২০১৮ সালের পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।
বিএফটিআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিআইও) ড. মোস্তফা আবিদ খান সম্প্রতি এক সেমিনারে এই তথ্য উপস্থাপন করেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। যদিও তিন বছর সময় পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু এরপরও এটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, এই তিন বছর সময়কে ভালো কাজে লাগাতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যে সংস্কার আনতে হবে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে। কোনো কিছুই নীতিমালায় আটকে রাখা যাবে না। বিশেষ করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি; দক্ষতা না বাড়লে শিল্প আগাবে না। বর্তমানে এলডিসিভুক্ত ৪৯টি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের নভেম্বরে এই তালিকা থেকে উত্তরণের কথা ছিল। কিন্তু করোনার কারণে বাংলাদেশের আবেদনের পর তা দুই বছর পিছিয়ে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত করে জাতিসংঘের এ সংক্রান্ত কমিটি। তবে এলডিসি উত্তরণ হলে বাংলাদেশের নানা ধরনের সুবিধা কমে যাবে। এ কারণে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে উত্তরণ প্রক্রিয়া আরও তিন বছর পেছানোর আবেদন করে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, চলতি মাসের মধ্যেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আসবে এবং তিন বছর কীভাবে কাজে লাগানো হবে তারও একটি কর্মপরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে।
বিএফটিআইর প্রতিবেদনে বলা হয়, এলডিসি উত্তরণের পর কিছু বাণিজ্য সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। এতে রপ্তানি ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ কমবে, যার আর্থিক মূল্য ৬৩৮ কোটি ডলার। তবে এটি সম্ভাব্য ক্ষতির প্রাক্কলন। কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও জাপানের মতো বড় বাজারে উত্তরণের পরও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শুল্কমুক্ত সুবিধা বহাল রাখার সুযোগ রয়েছে। জাপানের সঙ্গে ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সই হয়েছে এবং আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের বাজারে রপ্তানি ২৬ দশমিক ২৮ শতাংশ, কানাডায় ৪২ দশমিক ০৫ শতাংশ, জাপানে ৩০ দশমিক ৫৩ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ২৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং চীনের বাজারে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ কমতে পারে।
বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যের অভাব একটি বড় দুর্বলতা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি ছিল ৪ হাজার ৮২৮ কোটি ডলার, যার মধ্যে ১১টি প্রধান পোশাক ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের অংশ ছিল ২ হাজার ৫৭৭ কোটি ডলার বা ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তৈরি পোশাক, পাটজাত পণ্য এবং হস্তশিল্পের মতো যেসব পণ্যের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা বেশি আসছে, সেগুলোতে বিশেষ জোর দিতে হবে। উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক ও নীতিগত সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি দূতাবাসগুলোকে বাজারজাতকরণে কাজে লাগাতে হবে।
দেশের অর্থনীতির কয়েকটি সূচকও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ ছিল জিডিপির ৩২ দশমিক ০৫ শতাংশ, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে ২৯ দশমিক ৩৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ ২৪ দশমিক ৫২ শতাংশ থেকে কমে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০২১-২২ অর্থবছরের ৭ দশমিক ১০ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে মোট দেশজ সঞ্চয় ২৫ দশমিক ২২ শতাংশ থেকে কমে ২৩ দশমিক ২৫ শতাংশ হয়েছে। রাজস্ব আদায়ের অবস্থাও দুর্বল; ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব ছিল ১০ দশমিক ৪ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৯৫ শতাংশে নেমেছে।
ওষুধশিল্পের ক্ষেত্রে ট্রিপস চুক্তি বাস্তবায়নের চাপ বাড়বে। দেশের চাহিদার ৯৮ শতাংশ পূরণকারী এই শিল্পে নতুন পেটেন্ট পাওয়া ওষুধের ক্ষেত্রে বিদেশি কোম্পানি বেশি রয়্যালটি দাবি করতে পারে। তবে সব আন্তর্জাতিক সহায়তা বন্ধ হবে না। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার ঋণের শর্ত কঠিন হতে পারে এবং জার্মানির ক্ষেত্রে অনুদানের পরিবর্তে ঋণের পরিমাণ বাড়বে। জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেটে বাংলাদেশের চাঁদার পরিমাণ বর্তমানে শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশের স্তরে থাকলেও উত্তরণের পর তা আনুমানিক শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ হতে পারে।
বাজার সুবিধা ধরে রাখার সুযোগ রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেসব বাজারে তিন বছরের জন্য সুবিধা অব্যাহত থাকবে, সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় ২ হাজার ৯৩৮ কোটি ডলার। দুই বছরের জন্য সুবিধা বাড়তে পারে এমন বাজারে রপ্তানি ছিল প্রায় ১৬০ কোটি ডলার। দীর্ঘমেয়াদী প্রতিযোগিতা সক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য ২০২৬-২০২৯ মেয়াদে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর জাতীয় কর্মপরিকল্পনার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এতে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা, ব্যবসার নিয়ম সহজ করা, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, রপ্তানি বৈচিত্র্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, বন্দর দক্ষতা, বিদেশি বিনিয়োগ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২