
বাংলাদেশে সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা বণ্টনে ধনী ও গরিবের মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য বিদ্যমান। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট' শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমাজের সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষ বছরে গড়ে ১০ হাজার ৪৭২ টাকা এই সুবিধা পান, যেখানে সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষ পান মাত্র ৭ হাজার ১৪০ টাকা।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশের প্রায় ৬২ শতাংশ দরিদ্র মানুষ প্রধান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতার বাইরে রয়েছেন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর (নিচের দিকের ২০ শতাংশ) মধ্যে ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ সরাসরি সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পেলেও, প্রায় অর্ধেক দরিদ্র পরিবার কোনো ধরনের সুবিধাই পায় না। অন্যদিকে, সমাজের সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশের মধ্যে ৩১ শতাংশ সরাসরি এই সরকারি সুবিধা ভোগ করেন।
মঙ্গলবার বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম বক্তব্য রাখেন। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ নাজমুস সাদাত খান ও ধ্রুব শর্মা।
দারিদ্র্য কমাতে 'ফ্যামিলি কার্ড' কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তাদের মতে, প্রচলিত পদ্ধতিতে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে বছরে ১৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে আনা সম্ভব। তবে যদি পরিকল্পিতভাবে প্রকৃত সুবিধাভোগী চিহ্নিত করে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া যায়, তাহলে বছরে সাড়ে ২৮ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠানো সম্ভব হবে। এর জন্য কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ জরুরি, যার মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য পরিমাপের স্বীকৃত মানদণ্ড ব্যবহার, নগদ টাকা ও খাদ্যসহায়তার প্রকৃত সুবিধাভোগী চিহ্নিতকরণ এবং ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে অন্যান্য সামাজিক সুবিধার যোগসূত্র স্থাপন।
বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা জানান, সমাজের নিচের দিকের ২০ শতাংশ গরিব মানুষকে তাদের আয়ের ৬০ শতাংশ খাবার কিনতে খরচ করতে হয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কৃষি মন্ত্রণালয় যদি প্রতি ১০ টাকায় ৮ টাকা ভর্তুকি দেয়, তাহলে খাদ্যনিরাপত্তায় কৃষি খাতের অবদান কীভাবে আসবে? তার মতে, খাদ্যনিরাপত্তায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ সম্ভব হচ্ছে না এবং গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে ভর্তুকির বোঝা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, বিদ্যমান পদ্ধতিতে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা দিলে বছরে প্রায় ১৬ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করতে পারবে, কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে কার্ড পৌঁছালে এই সংখ্যা সাড়ে ২৮ লাখে উন্নীত হবে।
বিদ্যুৎ খাতে সরকার যে ভর্তুকি দেয়, তার সুবিধাও ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই পান। তবে বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, যারা বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তারাই ভর্তুকির বেশি সুবিধা পান। সমাজের নিচের দিকের ২০ শতাংশ গরিব মানুষ বিদ্যুৎ খাতের মোট ভর্তুকির মাত্র ১৫ শতাংশের সামান্য বেশি পান, যেখানে ওপরের দিকের ২০ শতাংশ ধনী মোট ভর্তুকির ৩৩ শতাংশ ভোগ করেন। এর অর্থ হলো, বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির এক-তৃতীয়াংশই সমাজের ধনী ২০ শতাংশের জন্য ব্যয় হয়।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারে ভর্তুকি চার গুণ বেড়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সারে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ২৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেটের ৮০ শতাংশ ভর্তুকি দিতে হয়। বিশ্বব্যাংক কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ছোট ও ঝুঁকির মুখে থাকা কৃষকদের সুবিধা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে। এছাড়াও কৃষি খাতে গবেষণা, সম্প্রসারণ, মাটি পরীক্ষা, বাজারজাতকরণ ও পানি ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক আরও জানিয়েছে, সরকার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সাড়ে ৩ শতাংশ ভর্তুকি ও সামাজিক নিরাপত্তায় খরচ করলেও, এখনো বহু গরিব পরিবার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং তাদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। গত বছরের তুলনায় অতিরিক্ত ২১ লাখ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। কর্মসংস্থান থমকে আছে এবং নারীরা চাকরি হারাচ্ছেন। জাতীয় দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী, দারিদ্র্যের হার টানা চতুর্থ বছরের মতো বেড়েছে; ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা গত অর্থবছরে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। একই সময়ে আয়বৈষম্যও বেড়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২