
দেশের ব্যাংক খাতে এক লাখ কোটি টাকা আমানতের অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছে বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ব্যাংক। চলতি মাসেই ব্যাংকটির মোট আমানত প্রথমবারের মতো এই সীমা অতিক্রম করে। এর মাধ্যমে দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে ষষ্ঠ ব্যাংক হিসেবে লাখ কোটি টাকার আমানতের অভিজাত ক্লাবে নাম লেখাল ব্র্যাক ব্যাংক।
এর আগে ২০১৬ সালে দেশের প্রথম ব্যাংক হিসেবে এই মাইলফলক পার হয়েছিল রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। এরপর ২০২০ সালের জুনে বেসরকারি খাতের প্রথম ব্যাংক হিসেবে এই তালিকায় যুক্ত হয় ইসলামী ব্যাংক। ২০২১ সালে এই ক্লাবে প্রবেশ করে সরকারি খাতের আরও দুটি ব্যাংক—অগ্রণী ও জনতা ব্যাংক। আর চলতি বছরের গত জুলাই মাসে বেসরকারি খাতের পূবালী ব্যাংকের আমানত লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। নতুন করে ব্র্যাক ব্যাংক যুক্ত হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, দেশের মোট ২০ লাখ কোটি টাকা আমানতের প্রায় ৪০ শতাংশই এখন এই ছয়টি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক নানা সংকট, গ্রাহকদের আস্থার ঘাটতি, উচ্চ খেলাপি ঋণ ও দুর্বল তদারকি ব্যবস্থার মধ্যেও সুশাসন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও উন্নত সেবার মাধ্যমে ব্র্যাক ব্যাংক এই অর্জন নিশ্চিত করেছে। এছাড়া বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন খেলাপি ঋণ এবং সর্বোচ্চ মুনাফার দিক থেকেও শীর্ষে অবস্থান করছে ব্যাংকটি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দুর্বল ও সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলো নিয়ে গ্রাহকদের আস্থার সংকট তৈরি হওয়ায় অনেকেই এখন ভালো মানের ব্যাংকে টাকা স্থানান্তর করছেন, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে ব্র্যাক ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধিতে।
ব্র্যাক ব্যাংকের এই লাখ কোটি টাকা আমানতের অর্ধেকেরও বেশি এসেছে সাধারণ খুচরা গ্রাহকদের কাছ থেকে। গত জুন শেষে ব্যাংকটির খুচরা আমানতের পরিমাণ ছিল ৫০ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা, যা গত দুই মাসে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি বেড়ে বর্তমানে ৫৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ব্যাংকটিতে বর্তমানে প্রায় ১৬ লাখ ব্যক্তি পর্যায়ের খুচরা গ্রাহক রয়েছেন। চার বছর আগে অর্থাৎ ২০২২ সালের জুনে ব্যাংকটির খুচরা আমানত ছিল মাত্র ১৭ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা। এই চার বছরে খুচরা আমানত বেড়েছে ৩৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর পাশাপাশি করপোরেট ও এসএমই বা প্রাতিষ্ঠানিক আমানত বৃদ্ধির ফলেও ব্যাংকটির তহবিলের ভিত্তি অনেক শক্তিশালী হয়েছে।
আমানত বৃদ্ধির এই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাংকটি তাদের নেটওয়ার্ক ও প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তার ঘটিয়েছে। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির শাখা ও উপশাখা ছিল ২৬৩টি, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১২টিতে। এর পাশাপাশি এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাপ ‘আস্থা’ চালুর মাধ্যমে গ্রাহকদের লেনদেন আরও সহজ করা হয়েছে।
আর্থিক সূচকের পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালে ব্র্যাক ব্যাংকের আমানত ছিল ৬৬,৮৫৭ কোটি টাকা, যা গত মাস শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯১৫ কোটি টাকায়। একই সময়ে ঋণের পরিমাণ ৬২,৩৩৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৬,২০৮ কোটি টাকা। আমানতের তুলনায় ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকটি তাদের তহবিলের বড় অংশ সরকারি ট্রেজারিতে বিনিয়োগ করে বড় অঙ্কের মুনাফা অর্জন করছে। এছাড়া ২০২৪ সালে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ যেখানে ছিল ১,৬৪০ কোটি টাকা, তা চলতি বছরের আগস্ট শেষে কমে দাঁড়িয়েছে ১,৫৭৭ কোটি টাকায়। ফলে খেলাপি ঋণের হার ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশে নেমে এসেছে।
মুনাফার দিক থেকেও ব্র্যাক ব্যাংক নতুন রেকর্ড গড়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটি দেশের দেশীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ২,২৫১ কোটি টাকা মুনাফা করে। আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ব্যাংকটির মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১,৪২৩ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৯০৬ কোটি টাকা। ব্র্যাক ব্যাংকের এই মুনাফার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসছে দেশের অন্যতম শীর্ষ মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান ‘বিকাশ’ থেকে, যার ৫০ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংকের হাতে।
আর্থিক সূচকের এই অভাবনীয় সাফল্য নিয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, গ্রাহকদের গভীর আস্থা, শক্তিশালী সুশাসন সংস্কৃতি, গ্রাহকবান্ধব ও উদ্ভাবনী প্রোডাক্ট ডিজাইন, ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতা এবং দেশব্যাপী বিস্তৃত নেটওয়ার্কের কারণেই গত কয়েক বছর ধরে আমানতে আমাদের এই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে ধারাবাহিক সাফল্যের কারণে ব্র্যাক ব্যাংক এখন গ্রাহকদের কাছে আস্থার এক অনন্য নাম।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ব্র্যাক’ এই ব্যাংকের ৪৬ দশমিক ১৬ শতাংশ শেয়ারের অংশীদার। ফলস্বরূপ, ব্যাংকের অর্জিত মুনাফার একটি বড় অংশ ব্র্যাকের কাছে চলে যায়, যা দেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করা হয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২