Header Premium (728×90)

১০০ বায়োইকুইভ্যালেন্ট ওষুধের মাইলফলকে রেনাটা, জানালেন সিইও কায়সার কবির

দেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রেনাটা লিমিটেড সম্প্রতি ১০০টি বায়োইকুইভ্যালেন্ট ওষুধ তৈরির অনন্য এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে। এই অর্জনের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়েছে। বর্তমানে ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার ৬০টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে রেনাটা। এই অভাবনীয় সাফল্যের নেপথ্যের গল্প ও বায়োইকুইভ্যালেন্ট ওষুধের গুরুত্ব নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন রেনাটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ এস কায়সার কবির। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি শিশির মোড়ল।

রেনাটার এই যাত্রার শুরুটা ছিল বেশ চমকপ্রদ। বিখ্যাত মার্কিন ওষুধ কোম্পানি ফাইজার করপোরেশনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘ফাইজার ল্যাবরেটরিজ (বাংলাদেশ) লিমিটেড’ ১৯৯৩ সালে মালিকানা ও নাম পরিবর্তন করে ‘রেনাটা’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। শুরু থেকেই কোম্পানিটি মানসম্মত ও সাশ্রয়ী ওষুধ তৈরির ওপর জোর দিয়ে আসছিল। ২০১৫ সালের দিকে যখন রেনাটা বিদেশে ওষুধ রপ্তানির সুযোগ খুঁজছিল, তখন ইউরোপের এক ওষুধ ব্যবসায়ী কায়সার কবিরের কাছে জানতে চান তাদের কয়টি বায়োইকুইভ্যালেন্ট পণ্য আছে। উত্তর যখন ছিল ‘একটিও না’, তখন সেই ব্যবসায়ী মন্তব্য করেছিলেন, ‘তাহলে তোমার তো কোনো পণ্যই নেই।’ এই একটি মন্তব্যই রেনাটার চিন্তাভাবনা বদলে দেয় এবং তারা বায়োইকুইভ্যালেন্ট ওষুধ তৈরিতে মনোযোগ দেয়।

বায়োইকুইভ্যালেন্স মূলত ওষুধ খাতের মান নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার একটি বৈজ্ঞানিক পরিমাপক। সহজ ভাষায়, দুটি ভিন্ন কোম্পানির তৈরি একই জেনেরিক ও শক্তির ওষুধ মানবদেহে প্রয়োগের পর যদি রক্তের প্লাজমায় ওষুধের শোষণের হার ও মোট পরিমাণ সমান হয়, তবে তাদের বায়োইকুইভ্যালেন্ট বলা হয়। যেহেতু বাংলাদেশ নতুন ওষুধ আবিষ্কার না করে মূলত অন্যের আবিষ্কৃত ওষুধ কপি বা জেনেরিক সংস্করণ তৈরি করে, তাই এই জেনেরিক ওষুধটি মূল দামি ওষুধের মতো সমান কার্যকারিতা দিচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা জরুরি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো উন্নত দেশে ওষুধ রপ্তানির জন্য এই পরীক্ষার রিপোর্ট জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। এর ফলে চিকিৎসক ও রোগীরা নিশ্চিত থাকেন যে কম দামি জেনেরিক ওষুধ খেলেও চিকিৎসার মান কমবে না।

এই পরীক্ষাটি মূলত সুস্থ স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর পরিচালিত একধরনের জটিল ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। সাধারণত ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী জটিল রোগমুক্ত স্বেচ্ছাসেবকদের প্রথমে মূল আবিষ্কৃত ওষুধ এবং নির্দিষ্ট সময় পর পরীক্ষাধীন জেনেরিক ওষুধ দেওয়া হয়। এরপর নির্দিষ্ট সময় পরপর (যেমন ১৫ মিনিট, ৩০ মিনিট, ১ ঘণ্টা, ২ ঘণ্টা ইত্যাদি) রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে রক্তে ওষুধের সর্বোচ্চ ঘনত্ব, ঘনত্বে পৌঁছানোর সময় এবং মোট শোষণের পরিমাণ গ্রাফের মাধ্যমে তুলনা করা হয়। দুটি গ্রাফের রেখা মিলে গেলেই ওষুধ দুটিকে সমমানের বা বায়োইকুইভ্যালেন্ট হিসেবে গণ্য করা হয়।

এই জটিল প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত দক্ষ ও বিশেষায়িত জনবল। রেনাটা শুরুতে অস্ট্রেলিয়া থেকে একজন এবং যুক্তরাজ্য থেকে দুজন প্রশিক্ষক এনে নিজেদের কর্মীদের দীর্ঘ ছয় বছর ধরে প্রশিক্ষণ দেয়। বর্তমানে রেনাটার প্রায় ২০০ জনের একটি তরুণ দল এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। প্রতিটি বায়োইকুইভ্যালেন্ট পণ্য তৈরিতে গড়ে প্রায় এক লাখ ডলার খরচ হয়, তবে একটি বিশেষ পণ্যের ক্ষেত্রে এই ব্যয় আড়াই লাখ ডলারে পৌঁছেছিল। এই পরীক্ষার নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে রেনাটা সব সময় ভারত বা ইউরোপের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিরপেক্ষ কন্ট্র্যাক্ট রিসার্চ অর্গানাইজেশনের (সিআরও) সাহায্য নেয়, যাদের কাজের মান নিয়ে বিশ্বে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।

সব পরীক্ষায় যে শতভাগ সাফল্য আসে তা নয়, তবে রেনাটার সফলতার হার প্রায় ৭০ শতাংশ। বাকি ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল না এলেও সেখান থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে তারা শিক্ষার অংশ হিসেবে দেখেন। বর্তমানে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর দেশে বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করেনি। তবে কায়সার কবির মনে করেন, ওষুধের মান নিয়ে সব ধরনের সংশয় দূর করতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এটি বাধ্যতামূলক করা উচিত, যদিও এর জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, সময় ও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

এই গবেষণার অভিজ্ঞতা রেনাটার জন্য আয়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এখন ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন নামী প্রতিষ্ঠান রেনাটাকে তাদের জন্য জেনেরিক ওষুধ তৈরি বা ‘ডেভেলপ’ করে দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছে, যা উন্নত বিশ্বে বাজারজাত করা হবে। এই ওষুধ উন্নয়ন সেবা থেকে রেনাটা প্রতিবছর কয়েক মিলিয়ন ডলার আয় করছে, যা দেশের অর্থনীতিতেও বড় অবদান রাখছে।

এই প্রক্রিয়ায় একদল সুস্থ স্বেচ্ছাসেবক (সাধারণত ১৮-৪৫ বছর বয়সী) বাছাই করা হয়, যাঁদের কোনো জটিল রোগ নেই।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

মক্কা-জেদ্দাসহ সৌদির বিভিন্ন এলাকায় সিভিল ডিফেন্সের সতর্কতা জারি

সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কাসহ দেশটির বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সম্ভাব্য বিপদ বা ঝুঁকির বিষয়ে…

33 minutes ago

আ.লীগ ফিরলে জামায়াত নেতাদের আবারও ফাঁসি দেবে: রাশেদ খাঁন

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন বলেছেন, আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফেরাতে জামায়াত অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি জামায়াত…

35 minutes ago

মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতা ইসলামের চিরন্তন শিক্ষা

ইসলাম ধর্মে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, দয়া, ক্ষমা এবং একে অপরের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম।…

40 minutes ago

এমপি গাজী নজরুল আবারও রিমান্ডে, এবার ৪ দিনের

দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের আত্মহত্যার পেছনে প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে…

45 minutes ago

স্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করে নিপীড়িত হয়েছেন রুহুল আমিন গাজী: রিজভী

প্রয়াত সাংবাদিক রুহুল আমিন গাজীর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীর আলোচনা সভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী…

1 hour ago

তুরস্কের শানলিউরফায় ৫.৪ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত

তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শানলিউরফা প্রদেশে ৫.৪ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। তবে প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী এতে কোনো প্রাণহানি…

1 hour ago

This website uses cookies.