
সরকারের রাজস্ব আহরণের মূল দায়িত্ব পালনকারী বেনাপোল কাস্টমস হাউসে এখন অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ প্রকট হয়ে উঠেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতি এবং স্থলবন্দরে শুল্ক ফাঁকিবাজ চক্রের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধির পেছনে অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তাদের নীরব সমর্থন রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার কারণে সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অথচ কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা, আমদানিকারক ও তাদের মনোনীত সি অ্যান্ড এফ এজেন্টরা আর্থিকভাবে ফুলেফেঁপে উঠছেন।
সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় ‘টি এল ট্রেডিং’ নামক প্রতিষ্ঠানের ৬৮৭ প্যাকেজ ইমিটেশন জুয়েলারি পণ্য আটকের পর আমদানিকারককে জরিমানা করা হলেও, শুল্ক ফাঁকিবাজ চক্রের অন্যতম সদস্য আল আমিন সোহাগের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, ঢাকা চকবাজারের আমদানিকারক মোস্তাফিজুর রহমানের পণ্য চালানে প্রকৃত আমদানি মূল্য গোপন করা হয়েছিল এবং ঘোষণাকৃত ওজনের চেয়েও ২ হাজার ৪০ কেজি পণ্য বেশি পাওয়া গিয়েছিল। পণ্য চালানটির মেনুফেস্ট নং-৬০১/২০২৬/০০৩/০০৪৭২৭৯/০৮ এবং নিট ওজন ১৬ হাজার ৮৫৪ কেজি। আমদানিকারকের পক্ষে সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট প্রতিনিধি সোহাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ও ওরিয়েন্টাল ট্রেডিং সেন্টারের মালিক আল আমিন সোহাগ কাগজপত্র দাখিল করেছিলেন। এ বিষয়ে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার মো. রাহাত হোসেন জানান, কাস্টমস আইন ২০২৩ অনুসারে আমদানিকারককে জরিমানা করা হয়েছে, তবে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি সদুত্তর দেননি।
অভিযোগ রয়েছে, সহকারী কমিশনার তওফিকুর রহমানের সহায়তায় সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট মালিক সোহাগ মাত্র ৫১ লাখ টাকা মূল্যের পণ্য ঘোষণা দিয়ে ৬ কোটি টাকার পণ্য খালাসের চেষ্টা করেছিলেন। এছাড়া সহকারী কমিশনার অতুল গোস্বামী ও রাজস্ব কর্মকর্তা সনজুর যোগসাজশে ভারতীয় রপ্তানিকারক জি এন এক্সপোটার্সের ২০টির অধিক ইনসুলেটিং বার্নিস ফর কপার পণ্য চালানে (বি/ই নং- ৮৯৯৬২, ৮৬৯৭৮, ৮৫৩৬৫, ৮৭৭০১, ৮৯৯৮২, ৮৫৩৬) অনিয়ম করে আমদানিকারককে সর্বনিম্ন মূল্যধার্যে শুল্কায়নের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
গত ছয় মাসে বেনাপোল কাস্টমসে শুল্ক ফাঁকির অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। গত ৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে আরাফাত এন্টারপ্রাইজের মিথ্যা ঘোষণায় আমদানিকৃত ১৭ টন পাট বীজ জব্দ করা হয়। ১২ মার্চ ২০২৬ রাতে এনএসআই-এর তথ্যে বন্দরের ৩৭ নং শেডে অভিযান চালিয়ে সাফা ইমপেক্সের বেকিং পাউডার ঘোষণার আড়ালে আনা উচ্চ মূল্যের শাড়ি, থ্রিপিচ, কসমেটিকস ও কেমিক্যাল আটক করা হয়। ১৫ জুন ২০২৬ তারিখে টি এস ইন্টারন্যাশনালের মিথ্যা ঘোষণায় আনা ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের শাড়ি ও ফেসওয়াশ ক্রিম আটক করা হয়। এছাড়া ৩৪ নং কেমিক্যাল পণ্যাগারে রাখা আরাফাত এন্টারপ্রাইজের শিল্প কাঁচামাল ঘোষণার আড়ালে বিপুল পরিমাণ ভায়াগ্রা ঔষধ আটক করা হয়।
বেনাপোল কাস্টমসে ঘুষের বিনিময়ে অবৈধ সুবিধা দেওয়া এখন ওপেন সিক্রেট। ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রাজস্ব কর্মকর্তা শামীমা আক্তার ও তার সহযোগী হাসিবুর রহমানকে ২ লাখ ৭৬ হাজার ঘুষের টাকাসহ আটক করে। ২২ জুন ২০২৬ রাতে জব্দকৃত পণ্য পাচারের সময় সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী বিজিবির হাতে আটক হন। এছাড়া ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর কাস্টমসের সুরক্ষিত লকার ভেঙে ১৯ কেজি ৩৩৮ গ্রাম সোনা চুরির ঘটনায় ৭ জন কাস্টমস কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা কাস্টমস ব্যবস্থার চরম দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনারই প্রতিফলন।
জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার(এন এস আই) দেওয়া গোপণ তথ্যে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ২০২৬ সালের ১২মার্চ রাতে বন্দরের ৩৭নং শেডে অভিযান চালিয়ে শুল্ক ফাঁকি চেষ্টায় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সাফা ইমপেক্স এর বেকিং পাওডার ঘোষণায় আমদানিকৃত(মেনিফেস্ট নং- ৬০১/২০২৬/ ০০১/ ০০১৬৩৩৩/০৩) উচ্চ মূল্যের শাড়ী, থ্রিপিচ,কসমেটিক্স ও ক্যামিক্যাল আটক করে। নিয়োগকৃত সি এন্ড এফ এজেন্ট ছিলো মেসার্স হুদা ইন্টারন্যাশনাল।
বেনাপোল বন্দরের ৩৪ নাম্বার কেমিক্যাল পণ্যাগারে রাখা ঢাকার কামরাঙ্গীচরের মুসলিমবাগ এলাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আরাফাত এন্টারপ্রাইজ শিল্প কারখানার কাঁচামাল ঘোষণার আড়ালে( বি-এল-নংঃ ১৯০৪২) বিপুল পরিমান ভায়াগ্রাও ঔষধ আমদানি করলে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ঐ পণ্য চালানটি আটক করে। আমদানিকারকের নিয়োগকৃত সি এন্ড এফ এজেন্ট ছিলো হায়দার অ্যান্ড সন্স।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২