ঢাকা ০২:১৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬, ১ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
কমলাপুর টিটি পাড়া আন্ডারপাসে ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য চাপাতির ভয় দেখিয়ে পথচারীর কাছ থেকে লক্ষ টাকা ছিনতাই সুনামগঞ্জে বিয়ের ১১ দিনের মাথায় নববধূ নিখোঁজ চাটখিলে বাড়ির চলাচলের রাস্তা বন্ধের অভিযোগ, কয়েক বছর ধরে দুর্ভোগে একটি পরিবার খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধনে আগামীকাল দিনাজপুরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেড় বছরের সন্তানকে হত্যা করে মায়ের আত্মহত্যা রাজাপুরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে প্রাইভেট কার, দেড় বছরের শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু সিলেট নগরী থেকে ইয়াবা সহ আটক-১ রূপগঞ্জে নির্মাণাধীন ভবনে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে শ্রমিক নিহত দগ্ধ ২ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক পানি নিষ্কাশনের কালভার্টের মুখ বন্ধ করে জায়গা ভরাট ভোগান্তিতে কৃষকরা ফটিকছড়িতে ভিডিও ফাঁসের হুমকি দিয়ে নারীকে ব্ল্যাকমেইলে গ্রেফতার-৬

মামলার রাজনীতি, ভয় ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: কোন পথে যাচ্ছে গণতন্ত্র?

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৩১:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ৯৭ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
print news

গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি তিনটি মৌলিক উপাদানের উপর দাঁড়িয়ে থাকে—জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। এই তিনটির মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে যে প্রতিষ্ঠানটি, সেটি হলো গণমাধ্যম। রাষ্ট্র, সরকার, প্রশাসন ও ক্ষমতার কাঠামোকে জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় রাখার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম সাংবাদিকতা।

কিন্তু যখন ধারাবাহিকভাবে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা, হয়রানিমূলক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়েরের প্রবণতা বাড়তে থাকে, তখন প্রশ্ন ওঠে—এটি কি কেবল আইনি প্রক্রিয়ার অংশ, নাকি ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণের এক নীরব রাজনৈতিক কৌশল?

সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর, দুর্নীতি বা অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর, কিংবা ক্ষমতাবান মহলের সমালোচনা করার পর সাংবাদিকরা মামলার মুখোমুখি হচ্ছেন। কখনও মানহানি, কখনও ডিজিটাল নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট অভিযোগ, কখনও আবার অজ্ঞাতনামা অভিযোগকারী—সব মিলিয়ে একটি ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ ক্রমশ কমে আসছে। বরং একটি কাঠামোগত প্রবণতার ইঙ্গিত মিলছে, যেখানে আইনকে ব্যবহার করা হচ্ছে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে।

আইন অবশ্যই সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। সাংবাদিকরাও আইনের ঊর্ধ্বে নন। যদি কোনো প্রতিবেদনে ভুল থাকে, বিভ্রান্তিকর তথ্য থাকে কিংবা কারও সুনাম ক্ষুণ্ন হয়—তার প্রতিকার আইনের মাধ্যমে চাওয়া যেতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আইনের প্রয়োগ কি ন্যায়সংগত ও ভারসাম্যপূর্ণ হচ্ছে? নাকি আইনকে এমনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে সাংবাদিক ও গণমাধ্যম ভবিষ্যতে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশের আগে দশবার ভাবতে বাধ্য হন?

মামলার রাজনীতি ঠিক এখানেই। যখন কোনো সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই মামলা হয়, যখন একই ঘটনায় একাধিক স্থানে একাধিক মামলা দায়ের হয়, যখন সাংবাদিককে দূরবর্তী জেলায় হাজিরা দিতে বাধ্য করা হয়—তখন সেটি কেবল আইনি প্রতিকার নয়, বরং এক ধরনের বার্তা। সেই বার্তা হলো: “সীমা অতিক্রম করো না।” এ এক অঘোষিত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, যা আইনের ভাষায় নয়, বাস্তবতার চাপে কাজ করে।

ভয় একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক উপকরণ। সরাসরি সেন্সরশিপ হয়তো নেই, সংবাদপত্র বন্ধ করা হচ্ছে না, কিন্তু যদি প্রতিটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর মামলা ঝুলে থাকে, তাহলে সম্পাদকীয় কক্ষে স্বাভাবিকভাবেই আত্মনিয়ন্ত্রণ কাজ করবে। প্রতিবেদক ভাববেন—এই তথ্য প্রকাশ করলে মামলা হবে না তো? সম্পাদক ভাববেন—এই শিরোনাম কি ‘ঝুঁকিপূর্ণ’? এভাবেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা আত্মনিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি, যা প্রকাশ্য নিষেধাজ্ঞার চেয়েও বেশি কার্যকর।

একটি সমাজে যখন সাংবাদিকরা নিরাপদ থাকেন না, তখন সাধারণ নাগরিকও নিরাপদ থাকেন না। কারণ সাংবাদিকের কণ্ঠরোধ মানে জনগণের জানার অধিকার খর্ব হওয়া। দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার—এসব অন্ধকারেই থেকে যায়, যদি তা প্রকাশ করার সাহসী কণ্ঠগুলোকে আইনি জটিলতায় জড়িয়ে ফেলা হয়। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলাফল হয় ভয়াবহ: জনগণ তথ্যবঞ্চিত হয়, গুজব বাড়ে, আস্থার সংকট তৈরি হয়।

রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। গণমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা গণতান্ত্রিক মানসিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সমালোচনা শত্রুতা নয়; বরং সংশোধনের সুযোগ। একটি পরিণত রাষ্ট্র জানে—সমালোচনা থাকলেই উন্নতি সম্ভব। সংবাদমাধ্যম যদি অনিয়ম তুলে ধরে, সেটি রাষ্ট্রের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে, কিন্তু সেটি শেষ পর্যন্ত শুদ্ধতার প্রক্রিয়ার অংশ। মামলা দিয়ে সেই কণ্ঠরোধের চেষ্টা করলে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আইনের অপব্যবহার। আইন প্রণয়ন করা হয় নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে। কিন্তু যখন সেই আইনই নাগরিক—বিশেষ করে সাংবাদিক—দমনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বদলে ‘আইনের ভয়’ প্রতিষ্ঠা পায়। এটি কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়।

আমরা মনে করি, সমাধান রয়েছে। প্রথমত, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাগুলোতে স্বচ্ছতা ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, একই ঘটনার জন্য একাধিক মামলা দায়েরের সংস্কৃতি বন্ধে নীতিমালা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, মানহানি বা তথ্যগত ত্রুটির ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে সংশোধন, জবাব বা প্রতিকার চাওয়ার প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা যেতে পারে—মামলাই যেন একমাত্র পথ না হয়। চতুর্থত, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ জরুরি।

গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব আছে। দায়িত্বশীল, তথ্যভিত্তিক ও নৈতিক সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে হবে। ভুল হলে তা স্বীকার করতে হবে, সংশোধন প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু দায়িত্বশীলতার নামে ভয় দেখানো গ্রহণযোগ্য নয়। স্বাধীনতা ও দায়িত্ব—দুটিই পাশাপাশি চলতে পারে এবং চলতে হবে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—সত্যকে দীর্ঘদিন চেপে রাখা যায় না। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু তথ্য ও সত্যের শক্তি দীর্ঘস্থায়ী। যে সমাজে প্রশ্ন তোলা বন্ধ হয়ে যায়, সেখানে স্থবিরতা জন্ম নেয়। আর যে সমাজে প্রশ্ন করার স্বাধীনতা থাকে, সেখানেই অগ্রগতি সম্ভব।

আজ প্রয়োজন সংঘাত নয়, সংলাপ। প্রয়োজন মামলা নয়, জবাবদিহির সংস্কৃতি। প্রয়োজন ভয় নয়, আস্থা। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার প্রবণতা বন্ধ করে একটি নিরাপদ, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম পরিবেশ গড়ে তোলা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।

গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যেখানে তথ্যের প্রবাহ অবাধ থাকতে হয়। সেই প্রবাহকে রুদ্ধ করার যে কোনো প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকেই সংকুচিত করে। আমরা বিশ্বাস করি—সত্যের পথ কণ্টকাকীর্ণ হতে পারে, কিন্তু সেই পথই টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি।

সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ নয়, বরং শক্তিশালী ও স্বাধীন গণমাধ্যমই একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রের পরিচয়। এখন সিদ্ধান্তের সময়—আমরা কি ভয়ভিত্তিক নীরবতার পথে হাঁটব, নাকি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সাহসী পথে এগোব?

মাহের আহমেদ
সম্পাদক ও প্রকাশক
দৈনিক যখন সময়

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

 

মামলার রাজনীতি, ভয় ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: কোন পথে যাচ্ছে গণতন্ত্র?

আপডেট সময় : ১১:৩১:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
print news

গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি তিনটি মৌলিক উপাদানের উপর দাঁড়িয়ে থাকে—জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। এই তিনটির মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে যে প্রতিষ্ঠানটি, সেটি হলো গণমাধ্যম। রাষ্ট্র, সরকার, প্রশাসন ও ক্ষমতার কাঠামোকে জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় রাখার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম সাংবাদিকতা।

কিন্তু যখন ধারাবাহিকভাবে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা, হয়রানিমূলক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়েরের প্রবণতা বাড়তে থাকে, তখন প্রশ্ন ওঠে—এটি কি কেবল আইনি প্রক্রিয়ার অংশ, নাকি ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণের এক নীরব রাজনৈতিক কৌশল?

সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর, দুর্নীতি বা অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর, কিংবা ক্ষমতাবান মহলের সমালোচনা করার পর সাংবাদিকরা মামলার মুখোমুখি হচ্ছেন। কখনও মানহানি, কখনও ডিজিটাল নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট অভিযোগ, কখনও আবার অজ্ঞাতনামা অভিযোগকারী—সব মিলিয়ে একটি ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ ক্রমশ কমে আসছে। বরং একটি কাঠামোগত প্রবণতার ইঙ্গিত মিলছে, যেখানে আইনকে ব্যবহার করা হচ্ছে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে।

আইন অবশ্যই সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। সাংবাদিকরাও আইনের ঊর্ধ্বে নন। যদি কোনো প্রতিবেদনে ভুল থাকে, বিভ্রান্তিকর তথ্য থাকে কিংবা কারও সুনাম ক্ষুণ্ন হয়—তার প্রতিকার আইনের মাধ্যমে চাওয়া যেতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আইনের প্রয়োগ কি ন্যায়সংগত ও ভারসাম্যপূর্ণ হচ্ছে? নাকি আইনকে এমনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে সাংবাদিক ও গণমাধ্যম ভবিষ্যতে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশের আগে দশবার ভাবতে বাধ্য হন?

মামলার রাজনীতি ঠিক এখানেই। যখন কোনো সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই মামলা হয়, যখন একই ঘটনায় একাধিক স্থানে একাধিক মামলা দায়ের হয়, যখন সাংবাদিককে দূরবর্তী জেলায় হাজিরা দিতে বাধ্য করা হয়—তখন সেটি কেবল আইনি প্রতিকার নয়, বরং এক ধরনের বার্তা। সেই বার্তা হলো: “সীমা অতিক্রম করো না।” এ এক অঘোষিত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, যা আইনের ভাষায় নয়, বাস্তবতার চাপে কাজ করে।

ভয় একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক উপকরণ। সরাসরি সেন্সরশিপ হয়তো নেই, সংবাদপত্র বন্ধ করা হচ্ছে না, কিন্তু যদি প্রতিটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর মামলা ঝুলে থাকে, তাহলে সম্পাদকীয় কক্ষে স্বাভাবিকভাবেই আত্মনিয়ন্ত্রণ কাজ করবে। প্রতিবেদক ভাববেন—এই তথ্য প্রকাশ করলে মামলা হবে না তো? সম্পাদক ভাববেন—এই শিরোনাম কি ‘ঝুঁকিপূর্ণ’? এভাবেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা আত্মনিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি, যা প্রকাশ্য নিষেধাজ্ঞার চেয়েও বেশি কার্যকর।

একটি সমাজে যখন সাংবাদিকরা নিরাপদ থাকেন না, তখন সাধারণ নাগরিকও নিরাপদ থাকেন না। কারণ সাংবাদিকের কণ্ঠরোধ মানে জনগণের জানার অধিকার খর্ব হওয়া। দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার—এসব অন্ধকারেই থেকে যায়, যদি তা প্রকাশ করার সাহসী কণ্ঠগুলোকে আইনি জটিলতায় জড়িয়ে ফেলা হয়। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলাফল হয় ভয়াবহ: জনগণ তথ্যবঞ্চিত হয়, গুজব বাড়ে, আস্থার সংকট তৈরি হয়।

রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। গণমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা গণতান্ত্রিক মানসিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সমালোচনা শত্রুতা নয়; বরং সংশোধনের সুযোগ। একটি পরিণত রাষ্ট্র জানে—সমালোচনা থাকলেই উন্নতি সম্ভব। সংবাদমাধ্যম যদি অনিয়ম তুলে ধরে, সেটি রাষ্ট্রের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে, কিন্তু সেটি শেষ পর্যন্ত শুদ্ধতার প্রক্রিয়ার অংশ। মামলা দিয়ে সেই কণ্ঠরোধের চেষ্টা করলে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আইনের অপব্যবহার। আইন প্রণয়ন করা হয় নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে। কিন্তু যখন সেই আইনই নাগরিক—বিশেষ করে সাংবাদিক—দমনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বদলে ‘আইনের ভয়’ প্রতিষ্ঠা পায়। এটি কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়।

আমরা মনে করি, সমাধান রয়েছে। প্রথমত, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাগুলোতে স্বচ্ছতা ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, একই ঘটনার জন্য একাধিক মামলা দায়েরের সংস্কৃতি বন্ধে নীতিমালা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, মানহানি বা তথ্যগত ত্রুটির ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে সংশোধন, জবাব বা প্রতিকার চাওয়ার প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা যেতে পারে—মামলাই যেন একমাত্র পথ না হয়। চতুর্থত, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ জরুরি।

গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব আছে। দায়িত্বশীল, তথ্যভিত্তিক ও নৈতিক সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে হবে। ভুল হলে তা স্বীকার করতে হবে, সংশোধন প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু দায়িত্বশীলতার নামে ভয় দেখানো গ্রহণযোগ্য নয়। স্বাধীনতা ও দায়িত্ব—দুটিই পাশাপাশি চলতে পারে এবং চলতে হবে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—সত্যকে দীর্ঘদিন চেপে রাখা যায় না। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু তথ্য ও সত্যের শক্তি দীর্ঘস্থায়ী। যে সমাজে প্রশ্ন তোলা বন্ধ হয়ে যায়, সেখানে স্থবিরতা জন্ম নেয়। আর যে সমাজে প্রশ্ন করার স্বাধীনতা থাকে, সেখানেই অগ্রগতি সম্ভব।

আজ প্রয়োজন সংঘাত নয়, সংলাপ। প্রয়োজন মামলা নয়, জবাবদিহির সংস্কৃতি। প্রয়োজন ভয় নয়, আস্থা। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার প্রবণতা বন্ধ করে একটি নিরাপদ, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম পরিবেশ গড়ে তোলা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।

গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যেখানে তথ্যের প্রবাহ অবাধ থাকতে হয়। সেই প্রবাহকে রুদ্ধ করার যে কোনো প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকেই সংকুচিত করে। আমরা বিশ্বাস করি—সত্যের পথ কণ্টকাকীর্ণ হতে পারে, কিন্তু সেই পথই টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি।

সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ নয়, বরং শক্তিশালী ও স্বাধীন গণমাধ্যমই একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রের পরিচয়। এখন সিদ্ধান্তের সময়—আমরা কি ভয়ভিত্তিক নীরবতার পথে হাঁটব, নাকি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সাহসী পথে এগোব?

মাহের আহমেদ
সম্পাদক ও প্রকাশক
দৈনিক যখন সময়