সুধী পাঠক,
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক ঐতিহাসিক মোড় এবং গভীর চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে। বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট কেবল স্থিতাবস্থারই ইঙ্গিত দিচ্ছে না, বরং জনগণের মৌলিক আকাঙ্ক্ষা এবং গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতি এক গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে গড়া এই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য আমাদের সামনে এখন সময় এসেছে এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি হওয়ার।
১. ক্ষমতা বনাম বিরোধীতার চক্র এবং জবাবদিহিতার সংকট
দেশের রাজনীতি বর্তমানে ক্ষমতা দখল এবং ক্ষমতা রক্ষার এক ক্লান্তিকর দ্বন্দ্বে আবদ্ধ। সুস্থ নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং প্রতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অভাবে জনগণের আস্থা আজ নিম্নগামী। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি এবং জনগণের কাছে শাসকের দায়বদ্ধতা। কিন্তু যখন রাজনৈতিক অঙ্গন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে সীমিত হয়ে পড়ে, তখন বিরোধী স্বরকে কোণঠাসা করা হয় এবং জনগণের কণ্ঠস্বর দুর্বল হয়ে যায়। এই চক্রাকারে আবর্তিত রাজনীতি রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে দুর্বল করছে এবং সুশাসনের পথে প্রধান অন্তরায় সৃষ্টি করছে।
২. অর্থনৈতিক চাপ ও বৈষম্যের বিস্তার
উন্নয়নের চাকা ঘুরছে, এমন দাবি করা হলেও সাধারণ মানুষের জীবন আজ মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব ও লাগামহীন বৈষম্যের যাঁতাকলে পিষ্ট। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের আকাশছোঁয়া দাম মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। একদিকে যেমন অল্প সংখ্যক মানুষের হাতে বিপুল সম্পদ পুঞ্জীভূত হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি শিক্ষিত বেকার যুবকদের হতাশা বাড়ছে। ব্যবসায়িক অস্থিরতা ও নীতি-নির্ভরতার অভাব বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। উন্নয়নের স্লোগান তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল সমাজের সর্বস্তরে সমভাবে বন্টিত হয়। কিন্তু বাস্তবে সুষম সুযোগের বন্টন আজ এক মরীচিকা।
৩. প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন ও জনগণের আস্থার সঙ্কট
আগামী নির্বাচনকে ঘিরে যে আলোচনা এবং উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, তার মূলে রয়েছে সুষ্ঠু প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের গভীর অবিশ্বাস। একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত না হলে, ভোটের অধিকার কেবলই একটি আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়। যখন জনগণের ভোটাধিকার এবং তাদের ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন তারা রাজনীতি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। এই আত্মিক বিচ্ছিন্নতা গণতন্ত্রের জন্য চরম বিপজ্জনক।
৪. পরিবর্তনের পথ: অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি
আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে এই মুহূর্তে আমরা কোন সিদ্ধান্ত নিই তার উপর। আমাদের এখন নির্ধারণ করতে হবে, আমরা কি কেবল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ব্যক্তি বা দলের পরিবর্তন চাই, নাকি রাজনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন চাই?
প্রকৃত পরিবর্তন মানে:
শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান: নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া।
অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব: ভিন্ন মত, ভিন্ন পথ এবং প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বরকে রাজনীতিতে স্থান দেওয়া।
অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার: এমন নীতি প্রণয়ন, যা বৈষম্য কমাবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
৫. সিদ্ধান্ত এখন আমাদের হাতে
আমরা আর কতদিন এই একই দ্বিধা-বিভক্ত, ক্ষমতাকেন্দ্রিক এবং জবাবদিহিতাহীন রাজনীতি সহ্য করব? আমাদের নিজেদের এবং আমাদের উত্তর প্রজন্মের জন্য একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে, গতানুগতিক মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে।
আগামী নির্বাচন শুধু ভোটের দিন নয়; এটি আমাদের জাতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণের দিন।
সম্পাদক হিসেবে আমার কলম থেকে আজ এই প্রশ্নটিই রাখছি:
আমরা কি এই স্থবিরতা থেকে বেরিয়ে সত্যিকারের পরিবর্তন চাই, নাকি অতীতের মতোই সব অব্যবস্থা মেনে নিয়ে বর্তমান অবস্থাকেই বহন করে চলব?
মাহের আহমেদ
সম্পাদক ও প্রকাশক
দৈনিক যখন সময়
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক হোসেন মঞ্জিল, ৬/১, ধলপুর, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : হোসেন মঞ্জিল, ৬/১, ধলপুর, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪, বাংলাদেশ। সাব-হেড অফিস: টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২