স্টাফ রিপোর্টার রংপুর:
আজ (৫ নভেম্বর) বুধবার রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শহীদ মাহবুবার রহমানের শাহাদাতের ২ বছর পূর্ণ হলো। ২০২৩ সালের এই দিনে, রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে পায়রাবন্দ বাজারে সংঘটিত হয় এক নির্মম হত্যাকাণ্ড। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন তিনি।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে যখন তাঁর নিথর দেহ স্ট্রেচারে করে বের করা হয়, তখন উপস্থিত প্রত্যেকের চোখে জল। গলার পাশে ধারালো অস্ত্রের কোপ, মুখমণ্ডল ও দাড়িতে রক্তের দাগ—অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়। পরে জানা যায়, স্থানীয় একটি চক্রের পরিকল্পনায় হারুন নামের এক ব্যক্তি এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটায়।
২০২২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারির ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সাড়ে তিন হাজার ভোটের ব্যবধানে প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন শহীদ মাহবুবার রহমান। তাঁর বিজয় ছিল নীতির, সেবার, এবং জনগণের ভালোবাসার বিজয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডে স্তব্ধ হয়ে যায় একটি সম্ভাবনাময় নেতৃত্বের অধ্যায়।
তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছাত্র রাজনীতি দিয়ে। ১৯৯১ সালে তিনি ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবির রংপুর জেলা সভাপতি। পরবর্তীতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জনগণের সেবা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে গেছেন সারাজীবন। সর্বশেষ তিনি ছিলেন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন রংপুর জেলা সহ-সভাপতি।
চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি চারবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেন—২০০৩, ২০১১, ২০১৬ ও ২০২২ সালে। ন্যায়পরায়ণতা, সততা ও বিনয়ের কারণে তিনি মানুষের আস্থা অর্জন করেন ধীরে ধীরে। এলাকার বহু মসজিদ-মাদরাসার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি, সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ছিলেন অগ্রণী।
শহীদ মাহবুবার রহমান ছিলেন এক ব্যতিক্রম মানুষ—রিকশাচালক, মুচি, দিনমজুর—সবার সঙ্গে সমানভাবে কথা বলতেন। মানুষ তাঁকে এতটাই শ্রদ্ধা করত যে, কেউ তার আগে সালাম দিতে পেত না। আজও অনেক মানুষ তাঁর নাম উচ্চারণ করে কাঁদে, বলে “তাঁকে আগে সালাম দেওয়া হয়নি কোনোদিন।
তাঁর শাহাদাতের সংবাদ সহ্য করতে না পেরে তাঁরই নিবেদিত কর্মী রফিকুল ইসলাম হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। একই দিন, একই মাঠে অনুষ্ঠিত হয় নেতা ও কর্মীর জানাজা—যেখানে হাজারো মানুষ অংশ নেন। স্থানীয়দের মতে, পায়রাবন্দে এত বড়ো জানাজা আর কখনো দেখা যায়নি।
ধর্মপ্রাণ মাহবুবার রহমান সারাজীবন শাহাদাতের মৃত্যুর স্বপ্ন লালন করেছেন। তাহাজ্জুদের নামাজে কেঁদে কেঁদে তিনি আল্লাহর কাছে এমন মৃত্যুর দোয়া করতেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পার্থিবতা ও দুর্নীতির ছোঁয়া তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি।
পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন আদর্শ পিতা ও স্বামী। ১৯ বছর আগে স্ত্রীকে হারানোর পরও সন্তানদের মানুষ করেছেন ধর্ম ও নৈতিকতার আলোয়।
শহীদ মাহবুবার রহমানের পুত্র লাবিব আহসান জানান,
আব্বা কখনো রাগ করে কিছু শেখাতেন না। তাঁর কোমল আচরণই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা।”
ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারে তিনি নিয়মিত পারিবারিক দারস পরিচালনা করতেন, কুরআনের আয়াত ও ইতিহাস সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতেন। তাঁর জীবন ছিল মানুষকে কল্যাণ ও সত্যের পথে আহ্বান জানানোর এক অনবদ্য দৃষ্টান্ত।
তাঁর শাহাদাতের দুই বছর পরও পায়রাবন্দে তাঁর অনুপস্থিতি মানুষ অনুভব করে প্রতিদিন। তাঁর স্মৃতিতে এখনো কাঁদে অসংখ্য মানুষ, যাদের জীবন তিনি ছুঁয়ে গিয়েছিলেন তাঁর সততা, স্নেহ ও নেতৃত্বের মাধ্যমে। যাঁর সারাজীবনে কথার মাধ্যমে বা আচরণের মাধ্যমে কাউকে আঘাত দেওয়ার রেকর্ড নেই। তিনি সকলের কাছে তার বিদেহী রুহের মাগফিরাত কামনা করেছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক হোসেন মঞ্জিল, ৬/১, ধলপুর, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : হোসেন মঞ্জিল, ৬/১, ধলপুর, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪, বাংলাদেশ। সাব-হেড অফিস: টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২