সারাদেশ

তাঁতের শব্দ স্তব্ধ—রাজবাড়ীর বাহলডাঙ্গায় মুছে যাচ্ছে এক ঐতিহ্য

মোঃ মকবুলার রহমান নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি:

রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার বাহলডাঙ্গা কারিগরপাড়া। নামেই যার পরিচয়—তাঁতশিল্পই এই গ্রামের শিকড়। এক সময় এই গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই ঘুরত তাঁতের চরকা, আঙিনা ভরে থাকত সুতো আর তাঁতের আওয়াজে মুখর থাকত চারদিক। এখন সেই আওয়াজ নিস্তব্ধ, চরকাগুলো থেমে গেছে।

এই গ্রামের ৬৫ বছরের আহমেদ শেখ একসময় আঙিনার তিনটি তাঁতে লুঙ্গি ও গামছা বুনে সংসার চালাতেন। বাবার কাছ থেকেই উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছিলেন এই পেশা। যদিও আয় খুব বেশি ছিল না, তবে স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে চলতে পারতেন সম্মানের সঙ্গেই।

কিন্তু সময় বদলেছে, লুঙ্গির বাজার সঙ্কুচিত হয়েছে, মুনাফা দাঁড়িয়েছে টানাপোড়েনে। তাঁতের কাজ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন আহমেদ। এখন নিজের উঠানে পাটকাঠি আর পলিথিনে ছাওয়া অস্থায়ী চায়ের দোকানই তার অবলম্বন। মাটির চুলায় কেটলি বসিয়ে গাঁয়ের মানুষের হাতে তুলে দেন এক কাপ গরম চা।

‘তাঁতের পেশায় আর লাভ নেই। বাধ্য হয়ে ছেড়েছি। ছেলেরাও অন্য পেশায় গিয়েছে,’ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন আহমেদ।

শুধু আহমেদ নন, বাহলডাঙ্গার প্রায় ২০০ পরিবার আজ তাঁতের পেশা থেকে মুখ ফিরিয়েছে। শত শত বছর ধরে চলে আসা পেশাটি আজ অস্তিত্বের লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে

এখন হাতে গোনা কয়েকটি ঘরেই হয় তাঁতের কাজ। গ্রামের একটি বাড়ির টিনের চালাঘরে ৭০ বছর বয়সী জালাল উদ্দিন শেখ এখনও গামছা বুনছেন। পাশে বসে তার পুত্রবধূ জুঁথি খাতুন চরকায় সুতো কাটছেন। জালাল বললেন, ‘এক সময় প্রতিটি বাড়িতে তাঁত ছিল, এখন হয়তো আট–দশটি চালু আছে। সারাদিন খেটে খরচ বাদ দিয়ে ২০০ টাকাও থাকে না হাতে।’

জুঁথি কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে বিয়ের পর এ পরিবারে এসে তাঁতের কাজ শিখেছেন। বললেন, ‘স্বামী তাঁতের আয় দিয়ে কিছু করতে পারেন না। এখন পাবনায় বড় তাঁত কারখানায় কাজ করছেন।’

তাঁতশিল্পে আশার আলো জ্বালাতে চেয়েও জ্বলে উঠছে না। গ্রামেরই আরেক গৃহবধূ, ৪২ বছর বয়সী নাজমা খাতুন পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে বসিয়েছেন বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুম। বললেন, ‘এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছি। এখন সেই ঋণের কিস্তি শোধ করাই কষ্ট।’

তার স্বামী ইউনুস শেখ জানান, সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত তাঁরা দুজনই কাজ করেন। তবুও সব খরচ বাদ দিয়ে দিনে হাতে থাকে মাত্র ৫০০ টাকা। ‘আমার সন্তানদের এই পেশায় আনতে চাই না। যত কষ্টই হোক, তাদের পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছি।’

তাঁতিরা ঋণগ্রস্ত, বাজার নেই, আর আগ্রহী শ্রমিকও কম। ৫৯ বছর বয়সী শুকুর আলী বলেন, ‘আমার বাবা একবার সরকারি ঋণ পেয়েছিলেন—৩৫ বছর আগে। তারপর আর কেউ কিছু পায়নি। এখন কেউ সুতা কিনতে চায়, তাকে মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে টাকা ধার করতে হয়।’

স্থানীয় চেয়ারম্যান মো. আজমল আল বাহার বলেন, ‘বাহলডাঙ্গার তাঁত ঐতিহ্য ২০০ বছরের বেশি পুরনো। বহুবার উপজেলা সভায় বিষয়টি তুলেছি। কিন্তু কোনো উদ্যোগ নেই। যদি এখনই কিছু না করা হয়, তাহলে এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে।’

পাংশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম আবু দারাদ জানান, তাঁত বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা এলেও পরে কোনো অগ্রগতি চোখে পড়েনি। অথচ এই শিল্পকে বাঁচাতে প্রয়োজন জরুরি সহায়তা—বিশেষত সহজ শর্তে ঋণ ও আধুনিক প্রযুক্তি।

এই সংকট শুধু বাহলডাঙ্গায় নয়—সারা দেশেই তাঁতের অবস্থা করুণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ১৯৯০ সালে দেশে তাঁতের সংখ্যা ছিল দুই লাখের বেশি, আর ২০১৮ সালে তা নেমে এসেছে এক লাখের নিচে। অর্থাৎ ২৮ বছরে হারিয়ে গেছে প্রায় ৪৫ শতাংশ তাঁত।

ভাঙ্গা তাঁত বোর্ডের এক কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ বললেন, ‘রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুরে তাঁতির সংখ্যা কমছে। কারণ, সুতার দাম বেড়েছে, শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।’

ফরিদপুরের কানাইপুরের মফিজুল ইসলাম বললেন, ‘বাবা চালাতেন তিনটি তাঁত, আমি এখন কোনোমতে একটি চালাই। সুতার দাম বেড়েছে দ্বিগুণ, শ্রমিক নেই।’

মাদারীপুরের কালকিনির রাশিদা বেগম বলেন, ‘আগে কাপড় বিক্রি হতো, এখন মানুষ মেশিনে তৈরি সস্তা কাপড় চায়। আমাদের হাতে তৈরি কাপড় টিকে থাকতে পারছে না।’

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের প্রকল্প পরিচালক রতন চন্দ্র সাহা জানান, তাঁতিদের জীবনমান উন্নয়নে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হচ্ছে, তবে বাহলডাঙ্গার পরিস্থিতি বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা হবে।

এই যদি হয় বাস্তবতা, তাহলে প্রশ্ন জাগে—বাহলডাঙ্গা কি তবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে যাচ্ছে? এই শতবর্ষী তাঁতপল্লী কি হারিয়ে যাবে একেবারেই?

Md Omor Sunny

Recent Posts

পরশুরামে স্কুল শিক্ষার্থী বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটে মৃত্যু

দেলোয়ার হোসেন, ফেনী পরশুরাম উপজেলা প্রতিনিধি: ফেনী জেলা পরশুরাম উপজেলার উত্তর কাউতলী বটতলায় ইসলামিয়া সিনিয়র…

11 hours ago

নওগাঁয় খাবারের প্রলোভনে শিশুকে ধর্ষণ

ফখরুল আলম সাজু নওগাঁ জেলা বদলগাছী উপজেলা এ খাবারের প্রলোভন দেখিয়ে ১ শিশুকে ধর্ষণ ও…

11 hours ago

রূপগঞ্জে ব্যবসায়ীর বাড়িতে হামলা, আহত ৪, লুট ১২ লক্ষাধিক টাকার মালামাল

মোঃ ইসমাইল হোসেন, স্টাফ রিপোর্টার: নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে সশস্ত্র হামলার ঘটনায় চারজন…

11 hours ago

জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও বাড়েনি গণপরিবহনের ভাড়া

মোঃ রাব্বি হাসান দিনাজপুর জেলা প্রতিনিধি: দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর এখনো বাড়ানো…

12 hours ago

সুনামগঞ্জের বিদ্যুতের মেরামত করতে গিয়ে কৃষকের মৃত্যু

ফখরুল আলম সাজু সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলায় নিজ বসত ঘরে বিদ্যুতের কাজ করতে গিয়ে আরশ…

18 hours ago

নেত্রকোনায় স্ত্রীর হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়ার অভিযোগে স্বামী আটক

জান্নাতুল ফাহিমা তানহা, নিজস্ব প্রতিনিধি: নেত্রকোনা জেলা মদন উপজেলায় মারুফা আক্তার (২৭) নামের ১ নার্সের…

18 hours ago

This website uses cookies.